শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিভীষিকা: নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়

: চলনবিলের সময়
প্রকাশ: 2 hours ago

6

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশু ধর্ষণ ও হত্যার যেসব হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটছে, তা শুধু পরিবার নয়—পুরো জাতিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর, সিলেট, ঠাকুরগাঁও ও মুন্সীগঞ্জে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মানুষের মনে ক্ষোভ, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
শিশুরা সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত সদস্য হওয়ার কথা। অথচ আজ তারা ঘর, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি পরিচিত মানুষের কাছেও নিরাপদ নয়—এ বাস্তবতা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে একাধিক আইন রয়েছে। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়া সরকার শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং হেল্পলাইন ১০৯৮ চালু করেছে। তবুও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক প্রভাব ও সচেতনতার অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় অথবা বিচারে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফির অপব্যবহার, পারিবারিক অবহেলা ও নৈতিক শিক্ষার অভাব বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি অনলাইনে অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা এবং অপরাধের দ্রুত বিচার না হওয়াও অপরাধ প্রবণতা বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুধু আইন থাকলেই হবে না; তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা কার্যকর করা, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের “সেফ টাচ” ও “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি মানুষকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতিবেশী, শিক্ষক, আত্মীয়—সবার উচিত শিশুদের প্রতি আচরণ ও চলাফেরার বিষয়ে সচেতন নজর রাখা। কোনো শিশু নির্যাতনের ঘটনা গোপন না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো প্রয়োজন। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে যাতে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন থাকে এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আজ যদি আমরা শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ভয় ও সহিংসতার সমাজে বেড়ে উঠবে। তাই এখনই সময় কঠোর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com