বয়স কখনো কখনো ক্যালেন্ডারের একটি সংখ্যা মাত্র, মানুষের ভেতরের গল্পের বয়স তার চেয়ে অনেক বেশি। মনিকা বেলুচ্চির জীবন সেই গল্পেরই এক জীবন্ত উদাহরণ।
সৌন্দর্য তাকে পরিচিত করেছিল, কিন্তু সময় তাকে চিনিয়েছে। ৩০ সেপ্টম্বর ২০২৬, ৬২ বছরে পা দিয়েছেন এই ইতালিয়ান অভিনেত্রী ও মডেল।
ইতালির ছোট্ট শহর থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমার পর্দা—দীর্ঘ এই যাত্রায় মডেলিংয়ের র্যাম্প, ইউরোপীয় সিনেমা, হলিউডের বড় পর্দা, মাতৃত্ব, মঞ্চ জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই বদলেছে তার পরিচয়। কিন্তু ৬২-এ এসেও তার চোখে শেষের কোনো ক্লান্তি নেই, আছে নতুন গল্প বলার আকাঙ্ক্ষা।
১৯৬৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইতালির উমব্রিয়া অঞ্চলের ছোট শহর চিতা দি কাস্তেল্লোতে জন্ম মনিকার। অভিনয় তার জীবনের শুরু থেকেই নির্ধারিত কোনো স্বপ্ন ছিল না। তরুণ বয়সে আইন পড়ার পাশাপাশি পড়াশোনার খরচ চালাতে মডেলিং শুরু করেন তিনি।
ভোগ ইতালিয়ার স্মৃতিচারণে মনিকা জানিয়েছেন, মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৭৭ সালে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা হয় তার। ১৬ বছর বয়সে নিয়মিতভাবে ফ্যাশন জগতে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে পাড়ি জমান মিলানে। এরপর প্যারিস ও নিউইয়র্কের ফ্যাশন জগতেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
তবে ফ্যাশনের র্যাম্পই ছিল না তার শেষ গন্তব্য। সিনেমার প্রতি আগ্রহ তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় অভিনয়ের জগতে। ১৯৯১ সালে ‘লা রিফা’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। পরের বছরই বড় সুযোগ আসে ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ‘ব্রাম স্টোকার্স ড্রাকুলা’ছবিতে। এরপর ‘দ্য অ্যাপার্টমেন্ট’, ‘আন্ডার সাসপিশন’ ও ‘ব্রাদারহুড অব দ্য উলফ’ এর মতো ছবিতে অভিনয় করে ইউরোপীয় সিনেমায় নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
তবে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে তার পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয় ‘মালেনা’, ‘ইরিভার্সিবল’, ‘দ্য ম্যাট্রিক্স রিলোডেড’, ‘দ্য ম্যাট্রিক্স রেভল্যুশনস’, ‘দ্য প্যাশন অব দ্য ক্রাইস্ট’ এবং ‘দ্য ব্রাদার্স গ্রিম’ এর মতো ছবির মাধ্যমে। বিশেষ করে ২০০০ সালের ‘মালেনা’ তাকে আন্তর্জাতিক তারকা হিসেবে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ব্যক্তিজীবনেও কম অধ্যায় নেই মনিকার। ১৯৯৯ সালে ফরাসি অভিনেতা ভিনসেন্ট ক্যাসেলকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের দুই মেয়ে—দেভা ও লিওনি। ২০১৩ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। তবে সন্তানদের ঘিরে মনিকার জীবন বরাবরই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বড় মেয়ে দেভাও পরবর্তীতে মডেলিং ও অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করেন।
মা-মেয়ের একসঙ্গে ভোগ ইতালিয়ার প্রচ্ছদে উপস্থিতিও দিয়েছে বিশেষ আলোচনার জন্ম।
৫০ বছর বয়সে ‘স্পেকটার’ ছবিতে লুসিয়া সিয়ারার চরিত্রে অভিনয় করে আবারও আলোচনায় আসেন মনিকা। এরপর সিনেমার পাশাপাশি মঞ্চেও নিজের অন্য পরিচয় তুলে ধরেন। ‘মারিয়া কালাস: লেটার্স অ্যান্ড মেমোয়ার্স’ মঞ্চ প্রযোজনায় কিংবদন্তি অপেরা শিল্পী মারিয়া কালাসের চিঠি ও স্মৃতিকথা উপস্থাপন করেন তিনি।
আর বয়স? মনিকার কাছে বয়স কোনো সমাপ্তির নাম নয়। ৬০ বছর পূর্তির সময় ভোগ ইতালিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের বিচার নিয়ে ভয় কমে এবং নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা বাড়ে।
২০২৬ সালে ৬২ বছরে পা দিয়ে সেই ভাবনাই যেন আরও স্পষ্ট হয়েছে। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বয়সকে তিনি জীবনের ‘অসাধারণ উপহার’হিসেবে দেখেছেন।
২০২৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগেও দেখা গেছে তাকে। লেয়া মিসিয়ুসের ‘দ্য বার্থডে পার্টি’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন ক্রিস্তিনা নামের এক ইতালীয় চিত্রশিল্পীর চরিত্রে।
ইতালির ছোট শহর থেকে বিশ্ব সিনেমার আলো—মনিকা বেলুচ্চির গল্প তাই শুধু সৌন্দর্যের নয়। এটি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া, বয়সকে গ্রহণ করা এবং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে নতুন করে নিজের পরিচয় লিখে যাওয়ার গল্প।

বিনোদন ডেস্ক 
























