আমরা প্রায়ই দেখি এক টুকরো কাগজের জন্য সরকারি দপ্তরের বারান্দায় মানুষের দীর্ঘ সারি, পদে পদে ভোগান্তি আর হতাশা। মানুষের এই ভোগান্তি দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কাগজটির গুরুত্ব কতখানি? প্রকৃতপক্ষে, এটি কোনো সাধারণ কাগজ নয়; জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন একজন মানুষের নাগরিক সত্তার ভিত্তি এবং রাষ্ট্রপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলোর মূল চাবিকাঠি।
একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তার পরিচয় ও অধিকারের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে। জন্মসনদ ছাড়া একটি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে প্রবেশ করতে পারে না। জীবনের শুরুতেই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে শুরুতেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। আমাদের সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জন্মসনদ একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে। বয়স প্রমাণের আইনি দস্তাবেজ না থাকলে শিশুবিবাহ ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অপরাধ প্রতিরোধ, পাচার রোধ এবং শিশুশ্রম থেকে সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে জন্ম সনদই প্রথম আইনি প্রমাণপত্র।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নিবন্ধনের গুরুত্ব কেবল বাড়তেই থাকে। উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর সুবিধা পাওয়া থেকে শুরু করে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার মতো প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবার মূল চাবিকাঠি হলো জন্মনিবন্ধন। যার এই নিবন্ধন নেই, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কাছে সে একপ্রকার ‘অদৃশ্য’ মানুষ।
জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি মৃত্যুসনদও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যদিও আমাদের সমাজে এটিকে চরম অবহেলা করা হয়। একটি পরিবারে কারও মৃত্যু হলে তার আইনি স্বীকৃতি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত অধিকার রক্ষায় মৃত্যু সনদ অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় ও মৃত্যু নিবন্ধন ভূমিকা রাখে। মৃত্যুসনদ একজনের চলে যাওয়াকে নথিভুক্ত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে জানায় মানুষ ঠিক কোন বয়সে, কী কারণে বা কোন রোগে মারা যাচ্ছে। একটি দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন, সংক্রামক বা অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের মতো বড় সিদ্ধান্তগুলো এই সঠিক মৃত্যু নিবন্ধনের উপাত্তের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন পদ্ধতি আধুনিকায়নে বাংলাদেশ অগ্রসর হলেও নিবন্ধনের হারের দিকে থেকে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় এখনো বেশ পিছিয়ে আছে। বর্তমানে দেশে মাত্র ৫০ শতাংশ জন্ম এবং ৪৭ শতাংশ মৃত্যু নিবন্ধিত হয়। অন্যদিকে, বৈশ্বিক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন হার যথাক্রমে ৭৭ ও ৭৪ শতাংশ। ২০০৪ সালে প্রণীত ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর একটি মাইলফলক, কিন্তু গত দুই দশকে আইনটি তার যুগোপযোগিতা অনেকটাই হারিয়েছে।
বিদ্যমান আইনে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধন কার্যালয়ে নিবন্ধিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অভিভাবক বা পরিবারের ওপর; যেখানে স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত ও ‘ঐচ্ছিক’। অথচ, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুই বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জন্মগ্রহণ করছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শতভাগ সফলতা পাওয়া দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের এই দায়িত্ব সরাসরি হাসপাতালগুলোর ওপর ন্যস্ত করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৯ অনুযায়ী জন্মনিবন্ধনসহ সবার জন্য বৈধ পরিচয় নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে আইন সংস্কারের মাধ্যমে হাসপাতাল ও ক্লিনিককে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব প্রদান জরুরি। একই সঙ্গে, মাঠপর্যায়ে জনগণের অসচেতনতা, জনবল সংকট, নিবন্ধকদের দক্ষতার ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা কমিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে হবে। এ ছাড়াও, দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে, দেশে কোনো মানুষের জন্ম যেন অদৃশ্য না থাকে, কোনো মৃত্যু যেন নথিহীন না থাকে।
লেখক: কোঅর্ডিনেটর, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)।

মাশিয়াত আবেদিন 


















