একটি পেশাদার, আধুনিক ও স্বনির্ভর ক্রীড়া ক্লাব হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবকে গড়ে তোলার ঘোষণা এসেছিল জোরালোভাবেই। গত ৯ মে ক্লাব পরিদর্শনে এসে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ফুটবল, ক্রিকেট ও হকির পাশাপাশি আর্চারি, শুটিং, সাঁতার, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন ও স্কোয়াশের মতো ডিসিপ্লিন যুক্ত করে ক্লাবটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্পোর্টস কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নিদের্শনাও প্রদান করেন।
বাস্তবে সেই পুনর্গঠনের উদ্যোগ এগোয়নি একটুও ক্লাব-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও পুনর্গঠনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং ক্লাবের মাঠ, একাডেমি, ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ধানমন্ডি সোসাইটির ভূমিকা এবং ক্লাব পরিচালনায় বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
ক্লাব, মাঠ ও সোসাইটি- নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ধানমন্ডি মাঠের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় মাঠটির তদারকিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাশাপাশি ধানমন্ডি সোসাইটির সম্পৃক্ততার বিষয়টি। ওই প্রতিবেদনেই মাঠটি ইজারা নেওয়ার জন্য সোসাইটির পক্ষ থেকে আবেদন করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।
তৎকালীন সময়ে সোসাইটির পক্ষ থেকে মাঠটি সোসাইটি ও গণপূর্তের নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা জানানো হয়েছিল। তাতে সংশ্লিষ্ট এক পক্ষের প্রশ্ন- একটি সরকারি মাঠের ব্যবস্থাপনা এবং একটি ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ক্লাবের সাংগঠনিক কার্যক্রমে একটি সামাজিক সংগঠনের প্রভাব থাকা কতটা কার্যকর ও যুক্তিসংগত?
ক্লাবের পেশাদার ব্যবস্থাপনার বদলে নতুন করে ক্ষমতার আসা কর্মকর্তাদের কাজে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ক্লাব-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অভিজ্ঞ কোচ ও প্রশিক্ষকদের সরিয়ে দেওয়ার ফলে ফুটবল ও ক্রিকেট একাডেমির কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, একাডেমির আয় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়েও পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবের ক্রিকেট ও ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি ও মাসিক ফি থেকে নিয়মিত আয় হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আয়ের একটি অংশ কোচদের পারিশ্রমিক, একাডেমির পরিচালন ব্যয় এবং ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় হয়। এর আগে উদ্বৃত্ত অর্থ সাধারণত ক্রিকেট ও ফুটবল দলের ক্যাম্প ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যবহারের চর্চা ছিল।
ক্লাব-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক লেনদেনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে একাডেমির অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করা হলেও এখন নগদ অর্থ গ্রহণের ঘটনা বাড়ায় হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এমনকি ক্লাব-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দাবি করেছেন, প্রতি মাসে প্রায় ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনিয়ম হচ্ছে।
পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা ও নতুন সংকট ক্লাব-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় এক যুগ ধরে সাফওয়ান সোবহান ও ইসতিয়াক সাদেকের পৃষ্ঠপোষকতায় ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবের ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
গত ৮ মে ২০২৬ ক্লাবের অ্যাডহক কমিটির আহ্বায়ক ইসতিয়াক সাদেক তিন বছরের মধ্যে ক্লাবকে টেকসই করার এবং ডোনেশননির্ভরতা থেকে বের হয়ে নিজস্ব আয়ে পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানান। এর পরদিন ক্লাব পরিদর্শনে এসে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বনির্ভর স্পোর্টস কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
অভিযোগ উঠেছে, ওই সময়ের পর ইসতিয়াক সাদেকের নেতৃত্বাধীন অ্যাডহক কমিটির ভূমিকা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁদের দাবি, বর্তমানে ধানমন্ডি সোসাইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
জানা গেছে, একাডেমি থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ক্লাব পরিচালনা ও খেলোয়াড়দের পেছনে ব্যয় হলেও শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল ও ক্রিকেট দলের বড় আর্থিক ব্যয় দীর্ঘদিন পৃষ্ঠপোষকরাই বহন করেছেন বলে ক্লাব-সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ফুটবল ও ক্রিকেট মিলিয়ে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে এবং দীর্ঘ এক যুগে পৃষ্ঠপোষকদের ব্যয়ের পরিমাণ শত কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
চ্যাম্পিয়ন হয়েও অনিশ্চয়তায় ক্রিকেট দল ২০২৫-২৬ মৌসুমে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাব সর্বশেষ ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আসন্ন মৌসুমে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে অংশ নেওয়ার কথা দলটির। কিন্তু নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি ও দল পরিচালনা নিয়ে ক্লাব-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে দলটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়। ক্লাব-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, ক্রীড়া দল পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকরভাবে দল পরিচালনা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাবের আয় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেট দলের নিবন্ধন, খেলোয়াড় ধরে রাখা, কোচিং স্টাফ এবং নতুন মৌসুমের বাজেট- সবকিছু নিয়েই দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্লাবটির ফুটবলে ফেরার ঘোষণা নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর সংকট।
তবে কি ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবটি ‘সাসটেইনেবল ক্লাব’ হওয়ার স্বপ্ন থেকে কি পিছিয়ে যাচ্ছে? ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবকে ব্যক্তি বা অনুদাননির্ভরতার বাইরে এনে একটি স্বনির্ভর ও টেকসই ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার নিদের্শনাও ছিল ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের। কিন্তু ক্লাব ঘিরে সৃষ্ট নানা অভিযোগ আর প্রশ্নগুলো সেই লক্ষ্য অর্জনের পথকে জটিল করে তুলছে।
এটি নিঃসন্দেহে ক্লাবটির জন্য সম্ভাবনাময় প্রত্যাবর্তনের বার্তা ছিল। কিন্তু ফুটবলে ফিরে আসার ঘোষণাকে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফুটবল একাডেমি থেকে সিনিয়র দল পর্যন্ত খেলোয়াড় তৈরির ধারাবাহিকতা কীভাবে নিশ্চিত হবে? অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফদের ভূমিকা কী হবে? ক্লাবের নিজস্ব রাজস্ব কাঠামো কী হবে? পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কই বা কীভাবে নির্ধারিত হবে?
‘সাসটেইনেবল ক্লাব’ হওয়ার স্বপ্ন কি পিছিয়ে যাচ্ছে? ৯ মে আমিনুল হকের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল- ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবকে ব্যক্তি বা অনুদাননির্ভরতার বাইরে এনে একটি স্বনির্ভর ও টেকসই ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। কিন্তু বর্তমানে সামনে আসা অভিযোগ ও প্রশ্নগুলো সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথকে জটিল করে তুলছে।

স্পোর্টস ডেস্ক 























