৫শত বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী শেখবাড়ি জামে মসজিদ

: চলনবিলের সময় ডেস্ক
প্রকাশ: 16 hours ago

27

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৫০০ বছর আগের নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর শহরের দক্ষিণ দৌলতপুর এলাকার শেখবাড়ি জামে মসজিদ। বাংলার স্বাধীন ও প্রভাবশালী সুলতানি আমলের নির্মিত এই প্রাচীন মসজিদ আজও ইতিহাসপ্রেমী ও ধর্মপ্রাণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে ১৪৯৪ থেকে ১৫১৯ সালের মধ্যে নির্মিত হয় এই মসজিদটি। শেখবাড়ির তৃতীয় পুরুষ শেখ মনুর সময়ে এই মসজিদ নির্মিত হয়। সেই সময় এটি ছিল পুরো এলাকার সর্বপ্রথম এবং একমাত্র মসজিদ। তখন এই মসজিদে একসঙ্গে ২০-২৫ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ নৌকায় করে এসে এই মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। মসজিদের কিছুটা পশ্চিমে রয়েছে পুরোনো ইট দিয়ে তৈরি একটি প্রাচীন কবরস্থান। তবে সেখানে কাদের সমাহিত করা হয়েছে, তা আজ আর কেউ বলতে পারেন না। বিষয়টি আজও অজানাই রয়ে গেছে।

পরে অবশ্য নতুন করে কবরস্থানটি মেরামত করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে শেখবাড়ির পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে। এমনকি দেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মা মরহুমা আয়েশা ফয়েজের কবরও এখানে অবস্থিত।

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৩৫ ফুট লম্বা ও পূর্বে-পশ্চিমে ৩৫ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো ইটের তৈরি এবং এতে দুটি দরজা রয়েছে। পাশেই রয়েছে একটি অজুখানা।

সারোয়ার শেখ বলেন, ‘এই মসজিদটি আমাদের তৃতীয় পুরুষ শেখ মনু সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে নির্মাণ করেন। আমাদের প্রথম পূর্বপুরুষ এসেছিলেন পারস্য থেকে, তার নাম ছিল শেখ চাঁন। শেখ চাঁনের ছেলে শেখ ফিরোজ এবং শেখ ফিরোজের ছেলে শেখ মনু। তিনি ১৪৯৪-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।

কালের বিবর্তনে মসজিদটি একপর্যায়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ২০১২ সালে মসজিদটি নতুন করে পুনর্নির্মাণ করা হলেও আগের সেই ঐতিহাসিক অবকাঠামো ও প্রাচীন রূপ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

মসজিদের কোষাধ্যক্ষ আলাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ১৯৮৭ সাল থেকে এই মসজিদে নামাজ পড়ি। এটি অনেক পুরোনো মসজিদ, আগে এখানে একটি বড় গম্বুজ ছিল। অল্প মানুষ একসাথে নামাজ আদায় করতে পারত। ভেতরে দুটি দরজা ছিল। ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে পড়ে যাওয়ার পর সেটি ভেঙে টিনের একটি ঘর করা হয়। দীর্ঘ সময় এভাবেই নামাজ পড়েছি আমরা। পরে আবার হাফবিল্ডিং করা হয়েছিল এবং বর্তমানে এই নতুন ভবনটি তৈরি করা হয়েছে।

শেখবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মুফতি আবু দারদা বলেন, গত নয় বছর যাবৎ এই মসজিদে ইমামতি করছি। এই মসজিদের পরিবেশ অনেক মনোরম এবং এখানকার মুসল্লিরা অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র।

শেখবাড়ি মসজিদের সাথে জড়িয়ে আছে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের স্মৃতি। কারণ, এই শেখবাড়ী ছিল হুমায়ূন আহমেদের নানাবাড়ী। মসজিদের পাশের পারিবারিক কবরস্থানেই শায়িত আছেন হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুন্নবী শেখ জানান, তখনকার সময়ে আশপাশে তেমন কোনো মসজিদ ছিল না। ৪ থেকে ৫ মাইল দূর থেকে মানুষ নৌকা নিয়ে এসে এই মসজিদে নামাজ আদায় করত। মসজিদটির পুরোনো আমলের অবকাঠামো যতটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা আমরা পেয়েছি। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরোনো দিনের মূল স্মৃতিগুলো আমরা পুরোপুরি ধরে রাখতে পারিনি।

সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন শাসক। তিনি ১৪৯৪ থেকে ১৫১৯ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। তার শাসনামলকে বাংলার ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। তিনি একাধারে ছিলেন দক্ষ প্রশাসক এবং শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মহান পৃষ্ঠপোষক। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এক অনন্য উদাহরণ ছিলেন তিনি। তার আমলে বাংলা সাম্রাজ্যের সীমানা যেমন বিস্তৃত হয়, তেমনই বহু মসজিদ, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জনকল্যাণমূলক কাজ সম্পন্ন হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যও তার সময়ে বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছিল।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com