
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী বাজারে আজ বসছে শতবর্ষী ঐতিহ্যের ‘বাঁশের মেলা’ ও ‘জামাই বরণ উৎসব’।
প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো এ লোকজ আয়োজন ঘিরে পুরো এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের কাছে এটি যেমন ‘বাঁশের মেলা’, তেমনি ‘জামাই মেলা’ নামেও সমান পরিচিত।
রোববার (২৪ মে) সকাল থেকে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এ মেলা চলবে সোমবার পর্যন্ত। এতে অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য, দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী ও আত্মীয়-স্বজন। বিশেষ করে জামাই আপ্যায়নকে কেন্দ্র করে মেলাটি পায় ভিন্ন মাত্রা।
বাংলার প্রাচীন গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ এই মেলা। সময়ের সঙ্গে অনেক লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নিমগাছীর বাঁশের মেলা এখনও নিজস্ব স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, চার থেকে সাড়ে চারশো বছর আগে এ অঞ্চলে বাঁশকে ঘিরে সামাজিক ও ধর্মীয় নানা আচার পালনের মধ্য দিয়েই এ মেলার সূচনা।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম রোববার একটি নির্দিষ্ট বাঁশ চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী রোববার সেই বাঁশ কেটে লাল শালুক কাপড়ে মুড়িয়ে সাজানো হয় ‘মাদার বাঁশ’ হিসেবে। পরে ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মাদার বাঁশ বহনকারী দল বিভিন্ন গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। এ সময় লাঠিখেলা, কসরত ও নানা লোকজ খেলার আয়োজন পুরো জনপদে ছড়িয়ে দেয় উৎসবের আবহ।
মেলাকে ঘিরে এখনও এলাকায় প্রচলিত রয়েছে জামাই বরণের পুরোনো রীতি। মেয়েরা বাপের বাড়ি আসে, আর জামাইদের জন্য থাকে বিশেষ আপ্যায়নের আয়োজন। কোন জামাই কত বড় মাছ নিয়ে আসবেন— তা নিয়েও চলে নীরব প্রতিযোগিতা। মাছ নিয়ে এলে জামাইকে দেওয়া হয় ‘পরবি’ বা উপহারস্বরূপ টাকা। অনেক পরিবারে এখনও জামাই ও মেয়েকে নতুন কাপড় এবং ছাতা উপহার দেওয়ার রেওয়াজ চালু আছে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এ মেলার সঙ্গে ওঁরাও ও মাহাতোসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাদের কাছে বাঁশ ছিল পবিত্রতার প্রতীক। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও সামাজিক রীতিনীতির সমন্বয়ে সময়ের পরিক্রমায় এটি বৃহৎ লোকজ উৎসবে রূপ নেয়।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা জানান, ধান কাটা-মাড়াই শেষে এ আয়োজন গ্রামীণ জীবনে বাড়তি আনন্দ নিয়ে আসে। আত্মীয়-স্বজনের মিলন, জামাই আপ্যায়ন ও লোকজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এটি এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী। এখানে পাওয়া যায় ঝুড়ি, চালুনি, ডালা, হাতপাখা, মাছ ধরার ফাঁদসহ গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ। এছাড়া মাটির খেলনা, লোকজ অলংকার, কৃষি সরঞ্জাম, দই-মিষ্টি, ঝুড়ি মুড়কি এবং বড় বড় মাছের দোকানেও ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। ফলে পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ পরিণত হয় প্রাণবন্ত এক লোকজ মিলনমেলায়।
একসময় এ মেলায় লাঠিখেলা, পুতুল নাচ, পালাগান, জুমুর গান ও গ্রামীণ নাটক ছিল প্রধান আকর্ষণ। আধুনিক বিনোদনের প্রভাবে কিছু পরিবর্তন এলেও এখনও টিকে আছে লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান। সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরতে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শুধু সাংস্কৃতিক দিক থেকেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও মেলাটির গুরুত্ব অনেক। আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে পসরা সাজান। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারুশিল্পীরা পান পণ্য বিক্রির সুযোগ। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হয় নতুন প্রাণচাঞ্চল্য।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, নিমগাছীর ঐতিহ্যবাহী বাঁশের মেলা নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড়, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে। আধুনিকতার এই সময়ে শতবর্ষী এ আয়োজন তাই শুধু একটি মেলা নয়, বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।