ঢাকা , রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দুর্গাপূজা: প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত দিনভিত্তিক পূজা-পার্বণের ইতিহাস ও রীতি সার ডিলার নিয়োগ ‘বানরের পিঠা ভাগের মতো’: এমপি রায়হান অপু বিশ্বাসের জন্মদিনে শাকিবের হাতে অ্যাওয়ার্ড! তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ প্রথম পর্যায়ে আবেদনের সময় বাকি ৪ দিন বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্টে হাসানের হ্যাটট্রিক ‘জিদান আমাকে ফ্রান্স দলে ডাকেনি, আমি তাকে সম্মান করি কিন্তু…’ রিয়াদ বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে আবারও হামলা বিএনপির সিদ্ধান্ত ছিল আমার ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার: রুমিন ফারহানা সরকার পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু সিস্টেম একই রয়েছ: গোলাম পরওয়ার কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী

দুর্গাপূজা: প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত দিনভিত্তিক পূজা-পার্বণের ইতিহাস ও রীতি




বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে মহালয়া থেকে শুরু হয় উৎসবের আবহ। এরপর প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনা, চণ্ডীপাঠ, অঞ্জলি, সন্ধিপূজা ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দুর্গোৎসব। প্রতিটি দিনের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহাসিক পটভূমি ও নিজস্ব রীতি।

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অসুর শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয়ের কাহিনি দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান পৌরাণিক ভিত্তি। তবে অঞ্চল, সম্প্রদায় ও পারিবারিক প্রথাভেদে পূজার আচার-অনুষ্ঠানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

প্রতিপদ: উৎসবের প্রস্তুতি ও দেবীপক্ষের সূচনা

প্রতিপদ চন্দ্রপক্ষের প্রথম তিথি। দুর্গাপূজার প্রস্তুতিপর্বে এ সময় থেকেই অনেক স্থানে পূজার আয়োজন, মণ্ডপসজ্জা ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। কিছু প্রথায় দেবীর বোধন ও পূজার প্রস্তুতির সঙ্গে প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত বিশেষ আচার যুক্ত থাকে। তবে বাংলার প্রচলিত দুর্গাপূজায় মূল আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়।

দ্বিতীয়া: পূজার আয়োজন ও প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা

দ্বিতীয়া তিথিতে পূজার প্রস্তুতি এগিয়ে চলে। প্রতিমা, পূজামণ্ডপ, আলোকসজ্জা ও পূজার উপকরণ প্রস্তুত করার পাশাপাশি আয়োজকেরা উৎসবের শেষ মুহূর্তের কাজ সম্পন্ন করেন। এই প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই পূজাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ বাড়তে থাকে।

তৃতীয়া: মণ্ডপসজ্জা ও উৎসবের আমেজ

তৃতীয়া তিথিতে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সাজসজ্জার কাজ এগিয়ে চলে। প্রতিমাশিল্পীদের হাতে তৈরি দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবারের প্রতিমা পূর্ণতা পায়। গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন এলাকায় পূজার আয়োজনকে কেন্দ্র করে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।

চতুর্থী: প্রতিমা ও মণ্ডপের প্রস্তুতি

চতুর্থী তিথিতে অনেক পূজামণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন, সাজসজ্জা ও আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করার প্রস্তুতি চলে। পূজার আয়োজকেরা পুরোহিত, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় পূজার পরিবেশ গড়ে তোলেন।

পঞ্চমী: ষষ্ঠীর আগমনী প্রস্তুতি

পঞ্চমী তিথিতে পূজামণ্ডপগুলোতে উৎসবের প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়। প্রতিমা সাজানো, আলোকসজ্জা, মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধন এবং দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চলে। পরদিন ষষ্ঠীতে শুরু হবে দুর্গাপূজার প্রধান আনুষ্ঠানিকতা।

ষষ্ঠী: বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস

ষষ্ঠী দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রচলিত শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে এদিন দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হয়। বোধনের মাধ্যমে দেবীকে জাগ্রত ও পূজার জন্য আহ্বান করার প্রতীকী আচার সম্পন্ন করা হয়।

বাংলার শরৎকালীন দুর্গাপূজায় ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বোধন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পূজামণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে উৎসবের আনুষ্ঠানিক আবহ ছড়িয়ে পড়ে। ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের মূল পর্বের সূচনা ঘটে।

সপ্তমী: নবপত্রিকা স্নান ও মহাসপ্তমীর পূজা

সপ্তমী দুর্গাপূজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ভোরে নবপত্রিকা স্নান করিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। বাংলায় নবপত্রিকাকে অনেক সময় ‘কলাবউ’ বলা হয়। কলাগাছসহ নয় ধরনের উদ্ভিদ দিয়ে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়, যা প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কৃতির সংযোগকে তুলে ধরে।

এরপর দেবীর মহাসপ্তমীর পূজা, পুষ্পাঞ্জলি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য বাড়তে থাকে।

অষ্টমী: মহাষ্টমী, অঞ্জলি ও কুমারীপূজা

মহাষ্টমী দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। এদিন দেবী দুর্গার বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা উপবাস পালন করে দেবীর উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দেন। অনেক মণ্ডপে কুমারীপূজার আয়োজন করা হয়। এ পূজায় একজন কুমারীকে দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়।

অষ্টমীর পূজায় দেবীর শক্তি, সাহস, পবিত্রতা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের তাৎপর্য বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।

সন্ধিপূজা: অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণ

অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট—মোট ৪৮ মিনিটের সময়কে সন্ধিক্ষণ বলা হয়। এই সময় অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। প্রচলিত শাক্ত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সন্ধিক্ষণ দেবী দুর্গার চামুণ্ডা রূপের সঙ্গে যুক্ত।

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, চণ্ড ও মুণ্ড নামের অসুরকে পরাজিত করার সঙ্গে দেবীর এই রূপের সম্পর্ক রয়েছে। সন্ধিপূজায় প্রদীপ, ফুল, মন্ত্রোচ্চারণ এবং প্রচলিত রীতি অনুসারে বিশেষ নিবেদন করা হয়। দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ এই আচার ভক্তদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

নবমী: মহানবমীর পূজা ও হোম

নবমী তিথিতে দেবী দুর্গার মহানবমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক পূজামণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, হোম-যজ্ঞ, পুষ্পাঞ্জলি ও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। অষ্টমী ও নবমীর পূজার মধ্য দিয়ে দেবীর শক্তি, সাহস ও অসুরবিনাশের কাহিনি স্মরণ করা হয়।

নবমীর দিন পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ভিড় বাড়ে। অনেক জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। নবমী মূলত পূজার শেষ পূর্ণ দিনের আনুষ্ঠানিকতা ও আনন্দের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

দশমী: বিজয়া, সিঁদুরখেলা ও প্রতিমা বিসর্জন

দশমী দুর্গোৎসবের সমাপনী দিন। এদিন দেবী দুর্গার দশমীর পূজা ও প্রচলিত রীতি অনুসারে দর্পণ বিসর্জন সম্পন্ন হয়। অনেক পূজামণ্ডপে বিবাহিত নারীরা সিঁদুরখেলায় অংশ নেন। এরপর দেবীকে বিদায় জানিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হয়।

বিজয়া দশমী শুভশক্তির কাছে অশুভশক্তির পরাজয় এবং ন্যায় ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক। প্রতিমা বিসর্জনের পর মানুষ পরস্পরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়, প্রণাম করে এবং কোলাকুলির মাধ্যমে সৌহার্দ্য প্রকাশ করে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় কয়েক দিনের দুর্গোৎসব।

দুর্গাপূজা: ধর্মীয় আচার থেকে সামাজিক সম্প্রীতি

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলার সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য ও সামাজিক সম্প্রীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিমা নির্মাণে মৃৎশিল্পীদের দক্ষতা, ঢাকের বাদ্য, আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জা এবং মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিটি তিথির নিজস্ব তাৎপর্য থাকলেও ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন বাংলার প্রচলিত দুর্গোৎসবের প্রধান পর্ব হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। দেবীর আগমন, আরাধনা ও বিদায়ের মধ্য দিয়ে উৎসবটি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সত্যের পথে থাকা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার বার্তা দেয়।

দেবী দুর্গার আরাধনার মূল শিক্ষা—অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা। এই চেতনাই যুগে যুগে দুর্গাপূজাকে বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম প্রধান উৎসবে পরিণত করেছে।

লেখকঃ

লুৎফর রহমান হীরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

চলনবিলের সময়।

 

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপূজা: প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত দিনভিত্তিক পূজা-পার্বণের ইতিহাস ও রীতি

দুর্গাপূজা: প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত দিনভিত্তিক পূজা-পার্বণের ইতিহাস ও রীতি

আপডেট সময় : এক ঘন্টা আগে

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে মহালয়া থেকে শুরু হয় উৎসবের আবহ। এরপর প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনা, চণ্ডীপাঠ, অঞ্জলি, সন্ধিপূজা ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দুর্গোৎসব। প্রতিটি দিনের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহাসিক পটভূমি ও নিজস্ব রীতি।

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অসুর শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয়ের কাহিনি দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান পৌরাণিক ভিত্তি। তবে অঞ্চল, সম্প্রদায় ও পারিবারিক প্রথাভেদে পূজার আচার-অনুষ্ঠানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

প্রতিপদ: উৎসবের প্রস্তুতি ও দেবীপক্ষের সূচনা

প্রতিপদ চন্দ্রপক্ষের প্রথম তিথি। দুর্গাপূজার প্রস্তুতিপর্বে এ সময় থেকেই অনেক স্থানে পূজার আয়োজন, মণ্ডপসজ্জা ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। কিছু প্রথায় দেবীর বোধন ও পূজার প্রস্তুতির সঙ্গে প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত বিশেষ আচার যুক্ত থাকে। তবে বাংলার প্রচলিত দুর্গাপূজায় মূল আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়।

দ্বিতীয়া: পূজার আয়োজন ও প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা

দ্বিতীয়া তিথিতে পূজার প্রস্তুতি এগিয়ে চলে। প্রতিমা, পূজামণ্ডপ, আলোকসজ্জা ও পূজার উপকরণ প্রস্তুত করার পাশাপাশি আয়োজকেরা উৎসবের শেষ মুহূর্তের কাজ সম্পন্ন করেন। এই প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই পূজাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ বাড়তে থাকে।

তৃতীয়া: মণ্ডপসজ্জা ও উৎসবের আমেজ

তৃতীয়া তিথিতে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সাজসজ্জার কাজ এগিয়ে চলে। প্রতিমাশিল্পীদের হাতে তৈরি দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবারের প্রতিমা পূর্ণতা পায়। গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন এলাকায় পূজার আয়োজনকে কেন্দ্র করে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।

চতুর্থী: প্রতিমা ও মণ্ডপের প্রস্তুতি

চতুর্থী তিথিতে অনেক পূজামণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন, সাজসজ্জা ও আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করার প্রস্তুতি চলে। পূজার আয়োজকেরা পুরোহিত, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় পূজার পরিবেশ গড়ে তোলেন।

পঞ্চমী: ষষ্ঠীর আগমনী প্রস্তুতি

পঞ্চমী তিথিতে পূজামণ্ডপগুলোতে উৎসবের প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়। প্রতিমা সাজানো, আলোকসজ্জা, মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধন এবং দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চলে। পরদিন ষষ্ঠীতে শুরু হবে দুর্গাপূজার প্রধান আনুষ্ঠানিকতা।

ষষ্ঠী: বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস

ষষ্ঠী দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রচলিত শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে এদিন দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হয়। বোধনের মাধ্যমে দেবীকে জাগ্রত ও পূজার জন্য আহ্বান করার প্রতীকী আচার সম্পন্ন করা হয়।

বাংলার শরৎকালীন দুর্গাপূজায় ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বোধন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পূজামণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে উৎসবের আনুষ্ঠানিক আবহ ছড়িয়ে পড়ে। ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের মূল পর্বের সূচনা ঘটে।

সপ্তমী: নবপত্রিকা স্নান ও মহাসপ্তমীর পূজা

সপ্তমী দুর্গাপূজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ভোরে নবপত্রিকা স্নান করিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। বাংলায় নবপত্রিকাকে অনেক সময় ‘কলাবউ’ বলা হয়। কলাগাছসহ নয় ধরনের উদ্ভিদ দিয়ে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়, যা প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কৃতির সংযোগকে তুলে ধরে।

এরপর দেবীর মহাসপ্তমীর পূজা, পুষ্পাঞ্জলি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য বাড়তে থাকে।

অষ্টমী: মহাষ্টমী, অঞ্জলি ও কুমারীপূজা

মহাষ্টমী দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। এদিন দেবী দুর্গার বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা উপবাস পালন করে দেবীর উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দেন। অনেক মণ্ডপে কুমারীপূজার আয়োজন করা হয়। এ পূজায় একজন কুমারীকে দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়।

অষ্টমীর পূজায় দেবীর শক্তি, সাহস, পবিত্রতা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের তাৎপর্য বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।

সন্ধিপূজা: অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণ

অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট—মোট ৪৮ মিনিটের সময়কে সন্ধিক্ষণ বলা হয়। এই সময় অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। প্রচলিত শাক্ত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সন্ধিক্ষণ দেবী দুর্গার চামুণ্ডা রূপের সঙ্গে যুক্ত।

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, চণ্ড ও মুণ্ড নামের অসুরকে পরাজিত করার সঙ্গে দেবীর এই রূপের সম্পর্ক রয়েছে। সন্ধিপূজায় প্রদীপ, ফুল, মন্ত্রোচ্চারণ এবং প্রচলিত রীতি অনুসারে বিশেষ নিবেদন করা হয়। দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ এই আচার ভক্তদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

নবমী: মহানবমীর পূজা ও হোম

নবমী তিথিতে দেবী দুর্গার মহানবমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক পূজামণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, হোম-যজ্ঞ, পুষ্পাঞ্জলি ও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। অষ্টমী ও নবমীর পূজার মধ্য দিয়ে দেবীর শক্তি, সাহস ও অসুরবিনাশের কাহিনি স্মরণ করা হয়।

নবমীর দিন পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ভিড় বাড়ে। অনেক জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। নবমী মূলত পূজার শেষ পূর্ণ দিনের আনুষ্ঠানিকতা ও আনন্দের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

দশমী: বিজয়া, সিঁদুরখেলা ও প্রতিমা বিসর্জন

দশমী দুর্গোৎসবের সমাপনী দিন। এদিন দেবী দুর্গার দশমীর পূজা ও প্রচলিত রীতি অনুসারে দর্পণ বিসর্জন সম্পন্ন হয়। অনেক পূজামণ্ডপে বিবাহিত নারীরা সিঁদুরখেলায় অংশ নেন। এরপর দেবীকে বিদায় জানিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হয়।

বিজয়া দশমী শুভশক্তির কাছে অশুভশক্তির পরাজয় এবং ন্যায় ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক। প্রতিমা বিসর্জনের পর মানুষ পরস্পরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়, প্রণাম করে এবং কোলাকুলির মাধ্যমে সৌহার্দ্য প্রকাশ করে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় কয়েক দিনের দুর্গোৎসব।

দুর্গাপূজা: ধর্মীয় আচার থেকে সামাজিক সম্প্রীতি

দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলার সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য ও সামাজিক সম্প্রীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিমা নির্মাণে মৃৎশিল্পীদের দক্ষতা, ঢাকের বাদ্য, আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জা এবং মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

প্রতিপদ থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিটি তিথির নিজস্ব তাৎপর্য থাকলেও ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন বাংলার প্রচলিত দুর্গোৎসবের প্রধান পর্ব হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। দেবীর আগমন, আরাধনা ও বিদায়ের মধ্য দিয়ে উৎসবটি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সত্যের পথে থাকা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার বার্তা দেয়।

দেবী দুর্গার আরাধনার মূল শিক্ষা—অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা। এই চেতনাই যুগে যুগে দুর্গাপূজাকে বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম প্রধান উৎসবে পরিণত করেছে।

লেখকঃ

লুৎফর রহমান হীরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

চলনবিলের সময়।