নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদী ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চল নুনেরটেক। যা আজ সবার কাছে ‘মায়াদ্বীপ’ নামেই পরিচিত। প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু প্রমত্তা মেঘনার তীব্র ভাঙনে দ্বীপটি আজ বিলীনের পথে।
মায়াদ্বীপের চিত্র এখন অত্যন্ত মর্মান্তিক। প্রতিদিন একটু একটু করে নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে এখানকার ভিটেমাটি, কৃষিজমি ও গাছপালা। নুনেরটেক গুচ্ছগ্রামের পশ্চিম প্রান্ত থেকে মায়াদ্বীপ হয়ে রগুনারচর মসজিদ ঘেঁষে কমলাপুর এলাকা এবং টেকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে চুয়াডাঙ্গা পশ্চিমপাড়া পর্যন্ত মেঘনার তীর এখন সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
এখানের অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা মৎস্য শিকার। মেঘনা নদী থেকে মাছ ধরেই চলে তাদের পরিবারের দিনাতিপাত। কিন্তু নদীভাঙনের কারণে তাদের জীবন-জীবিকা আজ হুমকির মুখে। এর ওপর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হলো নৌকা বা ট্রলার। নৌপথ ছাড়া মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের আর কোনো বিকল্প পথ না থাকায় অসুস্থ রোগী বা জরুরি প্রয়োজনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এই দ্বীপের বাসিন্দাদের।
স্থানীয় ফাতেমা বেগম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘চোখের পলকে বাপ-দাদার ভিটেমাটি মেঘনায় গ্রাস করে নিয়েছে। কোথায় যাব, কী খাব, কিছুই জানি না। রাতের ঘুমেও নদীর গর্জে ওঠার আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে। সরকার যদি দ্রুত বাঁধ বা গাইড ওয়াল নির্মাণ করে আমাদের রক্ষা না করে, তবে মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে মায়াদ্বীপ।’
আরেক ভুক্তভোগী নারী জাহানারা বেগম ও স্থানীয় জেলে আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। থাকার জায়গা না থাকায় অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানাই। ভাঙনের এ তাণ্ডবে এরই মধ্যে ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। ধীরে ধীরে নদীভাঙনের ফলে এরই মধ্যে কয়েক একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।’
মায়াদ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার জন্য অতীতে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম এ চরাঞ্চলকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার সময় বেশ কিছু পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি বদলি হয়ে চলে যাওয়ার পর প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে সেই সব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা আজ ভেস্তে গেছে। ফলে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ এক গভীর সংকটের মুখে এ জনপদ।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের বিশেষ সহকারী ও উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক সেলিম হোসেন দিপু দুর্গম জায়গাটি পরিদর্শনে আসেন। তিনি সরেজমিন ঘুরে সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ও মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র প্রত্যক্ষ করেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘এখানকার মানুষের চরম দুর্ভোগের কথা শুনে আমি এমপির পক্ষ থেকে সরেজমিন পরিদর্শনে এসেছি। নদীভাঙনের কারণে তারা পরিবার ও জীবন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। আমি বিষয়টি মাননীয় সংসদ সদস্যকে বিস্তারিত জানাব। আশা করছি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
মায়াদ্বীপের নাম রক্ষা করতে এবং এখানকার হাজার হাজার মানুষকে চিরতরে সর্বস্বান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে সময়োপযোগী ও স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা গাইড ওয়াল রিভেটমেন্ট নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় মেঘনার গর্ভে হারিয়ে যাবে প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি এই মায়াদ্বীপ। আর এর সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে যাবে অবহেলিত এ মানুষগুলোর বেঁচে থাকার শেষ ঠিকানা।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি 























