ঢাকা , বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাখির কলকাকলিতে মুখর চলনবিল, শঙ্কা অবৈধ শিকার




শীতের আগমনী বার্তায় অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ চলনবিল অঞ্চল। বিলের জলাভূমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখি। পাখির কিচিরমিচির, ডানা ঝাপটানো আর জলরাশির মিতালিতে বদলে গেছে বিলের চিরচেনা দৃশ্যপট। তবে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেই দেখা দিয়েছে অবৈধ পাখি শিকারের শঙ্কা। একশ্রেণির মৌসুমি ও সৌখিন শিকারির তৎপরতায় প্রাণ হারাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত চলনবিলে শীতের শুরুতেই আসতে শুরু করেছে নানা প্রজাতির অতিথি পাখি। কাকডাকা ভোরে খাবারের সন্ধানে পাখিরা নেমে আসে বিলের অগভীর জলাভূমিতে। নীল আকাশে ডানা মেলে তাদের উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে। সন্ধ্যা নামলে ঝাঁক বেঁধে গাছের ডালে নিরাপদ আশ্রয় নেয় পাখির দল।

বিলের অল্প পানিতে সাদাবক, গাংচিল, বালিহাঁস, পানকৌড়ি ও ডাহুকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ চোখে পড়ছে। পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরা কিংবা জলাভূমির ধারে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা বকের দৃশ্য প্রকৃতিতে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। অতিথি পাখির আগমনে চলনবিল যেন পরিণত হয়েছে পাখির এক মিলনমেলায়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে পাখি শিকারের উদ্বেগজনক চিত্র।

পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত চলনবিলের বিভিন্ন জলাভূমিতে সাদাবক, পানকৌড়ি, শামুকখোল, বালিহাঁসসহ নানা প্রজাতির পাখির দেখা মিলছে। হাঁটুপানিতে মাছ ও অন্যান্য খাদ্যের সন্ধানে বিচরণ করছে পাখির ঝাঁক। পাখির কলকাকলি ও অবাধ বিচরণে বিলজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোরম পরিবেশ। তবে নির্বিচারে পাখি শিকার চলতে থাকলে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

চলনবিলের কৃষকদের ভাষ্য, সাদাবক কৃষকের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। এ বছর বিলে প্রচুর অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে। এর মধ্যে সাদাবক ও শামুকখোলের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ছে। সাদাবক ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। জমিতে হালচাষের সময় কৃষকের পেছনে পেছনে দল বেঁধে বককে পোকামাকড় খুঁজতে দেখা যায়। পাখি শুধু কৃষির উপকারই করে না, বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বাড়িয়ে তোলে। এ কারণে স্থানীয়রা পাখি শিকার বন্ধে সচেষ্ট রয়েছেন বলে জানান।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘চলনবিল রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর আলম মধু বলেন, শীতপ্রধান দেশ থেকে প্রতিবছর এ সময়ে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি চলনবিলে আসে। খাদ্যের সন্ধানে তাদের বিচরণ ও আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। কিন্তু কিছু লোভী শিকারি ফাঁদ পেতে এসব পাখি শিকার করে। চলনবিলের পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

চাটমোহর উপজেলার বিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, চলনবিল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। এ বিলের পাখি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, কৃষির উপকারিতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে চলনবিলের পাখিদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। তাই অতিথি পাখির অবাধ বিচরণ অব্যাহত রাখতে শিকার বন্ধে প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন মহল।

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

জনপ্রিয় সংবাদ

পাখির কলকাকলিতে মুখর চলনবিল, শঙ্কা অবৈধ শিকার

আপডেট সময় : ১৫ ঘন্টা আগে

শীতের আগমনী বার্তায় অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ চলনবিল অঞ্চল। বিলের জলাভূমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখি। পাখির কিচিরমিচির, ডানা ঝাপটানো আর জলরাশির মিতালিতে বদলে গেছে বিলের চিরচেনা দৃশ্যপট। তবে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেই দেখা দিয়েছে অবৈধ পাখি শিকারের শঙ্কা। একশ্রেণির মৌসুমি ও সৌখিন শিকারির তৎপরতায় প্রাণ হারাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত চলনবিলে শীতের শুরুতেই আসতে শুরু করেছে নানা প্রজাতির অতিথি পাখি। কাকডাকা ভোরে খাবারের সন্ধানে পাখিরা নেমে আসে বিলের অগভীর জলাভূমিতে। নীল আকাশে ডানা মেলে তাদের উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে। সন্ধ্যা নামলে ঝাঁক বেঁধে গাছের ডালে নিরাপদ আশ্রয় নেয় পাখির দল।

বিলের অল্প পানিতে সাদাবক, গাংচিল, বালিহাঁস, পানকৌড়ি ও ডাহুকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ চোখে পড়ছে। পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরা কিংবা জলাভূমির ধারে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা বকের দৃশ্য প্রকৃতিতে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। অতিথি পাখির আগমনে চলনবিল যেন পরিণত হয়েছে পাখির এক মিলনমেলায়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে পাখি শিকারের উদ্বেগজনক চিত্র।

পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত চলনবিলের বিভিন্ন জলাভূমিতে সাদাবক, পানকৌড়ি, শামুকখোল, বালিহাঁসসহ নানা প্রজাতির পাখির দেখা মিলছে। হাঁটুপানিতে মাছ ও অন্যান্য খাদ্যের সন্ধানে বিচরণ করছে পাখির ঝাঁক। পাখির কলকাকলি ও অবাধ বিচরণে বিলজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোরম পরিবেশ। তবে নির্বিচারে পাখি শিকার চলতে থাকলে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

চলনবিলের কৃষকদের ভাষ্য, সাদাবক কৃষকের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। এ বছর বিলে প্রচুর অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে। এর মধ্যে সাদাবক ও শামুকখোলের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ছে। সাদাবক ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। জমিতে হালচাষের সময় কৃষকের পেছনে পেছনে দল বেঁধে বককে পোকামাকড় খুঁজতে দেখা যায়। পাখি শুধু কৃষির উপকারই করে না, বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বাড়িয়ে তোলে। এ কারণে স্থানীয়রা পাখি শিকার বন্ধে সচেষ্ট রয়েছেন বলে জানান।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘চলনবিল রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর আলম মধু বলেন, শীতপ্রধান দেশ থেকে প্রতিবছর এ সময়ে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি চলনবিলে আসে। খাদ্যের সন্ধানে তাদের বিচরণ ও আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। কিন্তু কিছু লোভী শিকারি ফাঁদ পেতে এসব পাখি শিকার করে। চলনবিলের পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

চাটমোহর উপজেলার বিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, চলনবিল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। এ বিলের পাখি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, কৃষির উপকারিতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে চলনবিলের পাখিদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। তাই অতিথি পাখির অবাধ বিচরণ অব্যাহত রাখতে শিকার বন্ধে প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন মহল।