ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘আমার বউ আমার টেনশন না, আপনাদের টেনশন’, সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুব্দ ওমর সানী নারীর শরীর নিয়ে সমাজের প্রত্যাশা কখনো শেষ হয় না: রাধিকা মদন কোমল পানীয়ের ওপর ‘চিনি কর’ আরোপ জার্মানির নতুন কুঁড়িতে এবার ১৬ লাখ খেলোয়াড়ের নিবন্ধন ব্যালন ডি’অর নিয়ে এমবাপ্পের ‘আমি, আমি’ স্বভাবে ফরাসি কিংবদন্তির ক্ষোভ অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো অভিযানের কোনো পরিকল্পনা নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইভীর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ঘিরে উত্তপ্ত নারায়ণগঞ্জ, আইনজীবীসহ গ্রেপ্তার ৩ হিন্দু সম্প্রদায়ের সমস্যা সমাধানে সরকার-বিরোধীদল সম্মিলিতভাবে কাজ করবে: জামায়াত আমির নেপালে ভয়াবহ বন্যা: পুনর্গঠনে ঢাকার সহযোগিতা চাইলেন রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর’ দুখু মিয়ার সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর’ দুখু মিয়ার সাক্ষাৎ




প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি ও শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দুখু মিয়াসহ ৩ অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি।

অন্য দুজন হলেন- বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ ও নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রমের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তাদের কাজের প্রশংসা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’

শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। সমাজ যাকে ‘অক্ষম’ ভেবে দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, তিনি নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আজ সমাজেরই এক উজ্জ্বল বাতিঘর। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো। যিনি ২০০৭ সাল থেকে নিজের গড়া ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’-এর মাধ্যমে আলো ছড়াচ্ছেন পুরো এলাকায়।

১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্ম নেন আলতাফ হোসেন। হাত ছাড়া জন্ম নেওয়ায় চরম হতাশায় বাবা-মা ভালোবেসে তার নাম রেখেছিলেন ‘দুখু মিয়া’। কিন্তু এই দুখু মিয়া যে একদিন হাজারো শিশুর দুঃখ দূর করে শিক্ষার আলো জ্বালাবেন, তা হয়তো সেদিন কেউ ভাবেনি।

শৈশবেই পড়াশোনার প্রতি তার ছিল দারুণ আগ্রহ। তবে সেই সময় হাতবিহীন এক শিশুর পড়াশোনার পথটা আজকের মতো মসৃণ ছিল না। খাতা-কলম কেনার সামর্থ্য কিংবা সুযোগ কোনোটিই সহজ ছিল না। ছেলের এই অদম্য আগ্রহ দেখে এগিয়ে আসেন মা-বাবা। মা মাটির চুলায় রান্না করা পাতিলের তলা থেকে চেঁছে কালো আবরণ (কালি) বের করতেন। সেই কালো গুঁড়ো একটি বড় পাত্রে রেখে পানি ঢেলে তৈরি করতেন লেখার কালি। আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে বানিয়ে দিতেন দোয়াত-কলম। সেই দোয়াত ও কঞ্চির কলম নিয়ে, মায়ের বানানো কালিতে ভিজিয়ে প্রথমে কলাপাতায় পায়ের আঙুলে বাবার বানানো কলমটি দিয়ে লেখার হাতেখড়ি হয় দুখু মিয়ার।

কলাপাতায় শুরু হওয়া সেই অক্ষরজ্ঞানই পরবর্তীতে তার জীবনের মূল শক্তিতে পরিণত হয়। বাবা তাকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে মাদ্রাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ‘পা দিয়ে আরবি বই স্পর্শ করা যাবে না’ এমন অজুহাতে শিক্ষকরা তাকে ফিরিয়ে দেন। দমে না গিয়ে বাবা তাকে ভর্তি করান গ্রামের একটি স্কুলে। হাত নেই তো কী হয়েছে, মা-বাবার দেওয়া সেই অনুপ্রেরণা আর নিজের পা-কেই বানালেন ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম গুঁজে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। পা দিয়ে লিখেই ১৯৮২ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (ডিগ্রি) লাভ করেন।

উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে থাকার পরও চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় দুখু মিয়াকে। দুই হাত না থাকার কারণে সরকারি বা বেসরকারি- কোনো জায়গাতেই মেলেনি চাকরি। সংসারের হাল ধরতে শুরু করেন টিউশনি। কিন্তু তাতেও যখন অভাব দূর হচ্ছিল না, তখন বুঝতে পারেন প্রতিবন্ধকতাই তার চাকরি পাওয়ার প্রধান বাধা।

নিজের ওপর এই অন্যায়ের জবাব তিনি দিলেন এক অভিনব ও অনুপ্রেরণামূলক উপায়ে। অন্যের অধীনে চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে নিজেই উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৭ সালে নিজের জমানো মূলধন আর অদম্য স্বপ্নকে সঙ্গী করে পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আজ দুখু মিয়ার সেই বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত প্রতীক। যে সমাজ তাকে একসময় করুণার চোখে দেখত, আজ সেই সমাজই তাকে নিয়ে গর্ব করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, হাত না থাকলেও কেবল মনের জোরেই জীবনের সব বাধা জয় করে সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব।

আলতাফ হোসেন ওরফে দুখু মিয়া বলেন, ‘আমার আগে বাবা-মায়ের ঘরে আরও দুটি সন্তান জন্ম নিয়ে মারা গেছে। তাদের পর আমার জন্য। জন্মের পর দেখেন আমার হাত নেই, সেজন্য আমাকে নিয়ে অনেকটা বেকায়দায় পড়েন বাবা-মা। তাই প্রথম বয়সে আমায় মাদ্রাসাতে ভর্তি করাতে নিয়ে যান। কিন্তু হাত না থাকায় আরবি বই পায়ে ধরা যাবে না ও লেখাও যাবে না, এই অজুহাতে মাদ্রাসায় আর ভর্তি নেনি। পরবর্তীতে স্কুলে ভর্তি হলে অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তারপরও আমার মা ও বাবার উৎসাহে আমি লেখাপড়া করতে আরও আগ্রহী হয়ে উঠি।’

তিনি বলেন, ‘মা রান্না করার পাতিল থেকে কালি সংগ্রহ করে দিনে আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে বানিয়ে দিতেন দোয়াত-কলম। যা দিয়ে কলা পাতায় লিখে আমার প্রথম হাতে খড়ি বলা চলে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে আমি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হই। কিন্তু ডিগ্রি অর্জন করেও দুই হাত না থাকায় কোথাও মেলেনি সরকারি-বেসরকারি চাকরি। টিউশনি করে নিজের এবং পরিবারের চাহিদা পূরণ না হওয়ায় অধিক বেতনে চাকরি খুঁজেছি। হাত না থাকায় কেউ একজন চাকরি দেয়নি। তাই জীবন চালাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলটিতে এখন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়, চেষ্টা করছি যাতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ানো যায় সে ব্যবস্থা করতে। বর্তমানে স্কুলটিতে দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে এ স্কুলটি পরিচালনা করতে নয়জন শিক্ষক রয়েছেন। তাদের বেতন দিতে অনেক হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় অনেক শিক্ষককে বেতন দিতে দুই তিন মাসও সময় লেগে যায়। সরকারের কাছে একটি আবেদন, যাতে স্কুলটি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয় এবং শিক্ষকদের বেতন যাতে সঠিক সময়ে দিতে পারি সে জন্য সরকার কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।’

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

জনপ্রিয় সংবাদ

‘আমার বউ আমার টেনশন না, আপনাদের টেনশন’, সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুব্দ ওমর সানী

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর’ দুখু মিয়ার সাক্ষাৎ

আপডেট সময় : ৮ ঘন্টা আগে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি ও শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দুখু মিয়াসহ ৩ অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি।

অন্য দুজন হলেন- বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ ও নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রমের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তাদের কাজের প্রশংসা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’

শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। সমাজ যাকে ‘অক্ষম’ ভেবে দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, তিনি নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আজ সমাজেরই এক উজ্জ্বল বাতিঘর। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো। যিনি ২০০৭ সাল থেকে নিজের গড়া ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’-এর মাধ্যমে আলো ছড়াচ্ছেন পুরো এলাকায়।

১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্ম নেন আলতাফ হোসেন। হাত ছাড়া জন্ম নেওয়ায় চরম হতাশায় বাবা-মা ভালোবেসে তার নাম রেখেছিলেন ‘দুখু মিয়া’। কিন্তু এই দুখু মিয়া যে একদিন হাজারো শিশুর দুঃখ দূর করে শিক্ষার আলো জ্বালাবেন, তা হয়তো সেদিন কেউ ভাবেনি।

শৈশবেই পড়াশোনার প্রতি তার ছিল দারুণ আগ্রহ। তবে সেই সময় হাতবিহীন এক শিশুর পড়াশোনার পথটা আজকের মতো মসৃণ ছিল না। খাতা-কলম কেনার সামর্থ্য কিংবা সুযোগ কোনোটিই সহজ ছিল না। ছেলের এই অদম্য আগ্রহ দেখে এগিয়ে আসেন মা-বাবা। মা মাটির চুলায় রান্না করা পাতিলের তলা থেকে চেঁছে কালো আবরণ (কালি) বের করতেন। সেই কালো গুঁড়ো একটি বড় পাত্রে রেখে পানি ঢেলে তৈরি করতেন লেখার কালি। আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে বানিয়ে দিতেন দোয়াত-কলম। সেই দোয়াত ও কঞ্চির কলম নিয়ে, মায়ের বানানো কালিতে ভিজিয়ে প্রথমে কলাপাতায় পায়ের আঙুলে বাবার বানানো কলমটি দিয়ে লেখার হাতেখড়ি হয় দুখু মিয়ার।

কলাপাতায় শুরু হওয়া সেই অক্ষরজ্ঞানই পরবর্তীতে তার জীবনের মূল শক্তিতে পরিণত হয়। বাবা তাকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে মাদ্রাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ‘পা দিয়ে আরবি বই স্পর্শ করা যাবে না’ এমন অজুহাতে শিক্ষকরা তাকে ফিরিয়ে দেন। দমে না গিয়ে বাবা তাকে ভর্তি করান গ্রামের একটি স্কুলে। হাত নেই তো কী হয়েছে, মা-বাবার দেওয়া সেই অনুপ্রেরণা আর নিজের পা-কেই বানালেন ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম গুঁজে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। পা দিয়ে লিখেই ১৯৮২ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (ডিগ্রি) লাভ করেন।

উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে থাকার পরও চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় দুখু মিয়াকে। দুই হাত না থাকার কারণে সরকারি বা বেসরকারি- কোনো জায়গাতেই মেলেনি চাকরি। সংসারের হাল ধরতে শুরু করেন টিউশনি। কিন্তু তাতেও যখন অভাব দূর হচ্ছিল না, তখন বুঝতে পারেন প্রতিবন্ধকতাই তার চাকরি পাওয়ার প্রধান বাধা।

নিজের ওপর এই অন্যায়ের জবাব তিনি দিলেন এক অভিনব ও অনুপ্রেরণামূলক উপায়ে। অন্যের অধীনে চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে নিজেই উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৭ সালে নিজের জমানো মূলধন আর অদম্য স্বপ্নকে সঙ্গী করে পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আজ দুখু মিয়ার সেই বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত প্রতীক। যে সমাজ তাকে একসময় করুণার চোখে দেখত, আজ সেই সমাজই তাকে নিয়ে গর্ব করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, হাত না থাকলেও কেবল মনের জোরেই জীবনের সব বাধা জয় করে সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব।

আলতাফ হোসেন ওরফে দুখু মিয়া বলেন, ‘আমার আগে বাবা-মায়ের ঘরে আরও দুটি সন্তান জন্ম নিয়ে মারা গেছে। তাদের পর আমার জন্য। জন্মের পর দেখেন আমার হাত নেই, সেজন্য আমাকে নিয়ে অনেকটা বেকায়দায় পড়েন বাবা-মা। তাই প্রথম বয়সে আমায় মাদ্রাসাতে ভর্তি করাতে নিয়ে যান। কিন্তু হাত না থাকায় আরবি বই পায়ে ধরা যাবে না ও লেখাও যাবে না, এই অজুহাতে মাদ্রাসায় আর ভর্তি নেনি। পরবর্তীতে স্কুলে ভর্তি হলে অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তারপরও আমার মা ও বাবার উৎসাহে আমি লেখাপড়া করতে আরও আগ্রহী হয়ে উঠি।’

তিনি বলেন, ‘মা রান্না করার পাতিল থেকে কালি সংগ্রহ করে দিনে আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে বানিয়ে দিতেন দোয়াত-কলম। যা দিয়ে কলা পাতায় লিখে আমার প্রথম হাতে খড়ি বলা চলে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে আমি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হই। কিন্তু ডিগ্রি অর্জন করেও দুই হাত না থাকায় কোথাও মেলেনি সরকারি-বেসরকারি চাকরি। টিউশনি করে নিজের এবং পরিবারের চাহিদা পূরণ না হওয়ায় অধিক বেতনে চাকরি খুঁজেছি। হাত না থাকায় কেউ একজন চাকরি দেয়নি। তাই জীবন চালাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলটিতে এখন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়, চেষ্টা করছি যাতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ানো যায় সে ব্যবস্থা করতে। বর্তমানে স্কুলটিতে দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে এ স্কুলটি পরিচালনা করতে নয়জন শিক্ষক রয়েছেন। তাদের বেতন দিতে অনেক হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় অনেক শিক্ষককে বেতন দিতে দুই তিন মাসও সময় লেগে যায়। সরকারের কাছে একটি আবেদন, যাতে স্কুলটি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয় এবং শিক্ষকদের বেতন যাতে সঠিক সময়ে দিতে পারি সে জন্য সরকার কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।’