ঢাকা , সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মৃত্যুর পরও কি নিরাপদ নয় নারীরা?

মর্গে বিভীষিকা: মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার




মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা হয় কবর কিংবা চিতা। সমাজ ও সভ্যতার রীতি অনুযায়ী মৃত মানুষকে সবসময়ই সসম্মানে শেষ বিদায় জানানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- মৃত্যুর পরও কি মানুষ সত্যিই নিরাপদ?

বিশেষ করে সেই মরদেহ যদি হয় কোনো নারীর, তবে মর্গের দরজা বন্ধ হওয়ার পর সেখানে আসলে কী ঘটে? রোববার (১৮ অক্টোবর) ইউটিউব চ্যানেল ‘আলাপ এক্সপ্লেইন্স’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য; যা অত্যন্ত অস্বস্তিকর, অমানবিক এবং বিকৃত মানসিকতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।

মর্গের হিমঘরে নরপিশাচের থাবা

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষস্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন থানা ও আশুলিয়া এলাকার মৃতদেহগুলোর ময়নাতদন্ত এখানেই হয়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেরি হলে পরিচয়হীন বা বেওয়ারিশ মরদেহগুলো রাখা হয় মর্গের হিমঘরে। আর এই হিমঘরকেই নিজেদের লালসা চরিতার্থ করার জন্য বেছে নিয়েছে কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা উত্তর সিটির একটি বাড়ি থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলা হলেও, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও সিআইডির ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ে তার শরীরে পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি মেলে!

একই ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেও। সেবারও অন্য এক নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের পর সিআইডির পরীক্ষায় একাধিক পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, মর্গের তৎকালীন ডোম বা কর্মচারীরাই এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

২০১৯ সালের পুনরাবৃত্তি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

মর্গে এমন বিকৃত যৌনাচার বা নেক্রোফিলিয়া বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৯ সালে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে মুন্না ভগত নামে এক সহকারী বা ডোমের বিরুদ্ধে একাধিক মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের প্রমাণ পেয়েছিল সিআইডি।

মুন্না ছিলেন তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালের ভাগ্নে এবং তার হাত ধরেই তার নিয়োগ হয়েছিল। সেই সময় যতনলাল গ্রেফতার হলেও পরবর্তীকালে জামিনে বেরিয়ে আসেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে মর্গ প্রধানের সহকারী নূরে আলম শান্ত ও তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নাম। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ আগেই নষ্ট করে ফেলা হলেও, সিআইডির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং ডিএনএ ম্যাচিংয়ে অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। এমনকি হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রতিবাদ করলে এই সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে তাদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সিআইডির তদন্তে জানা গেছে, শুধু ঢাকা নয়- এর আগে ২০২১ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও মর্গের কর্মচারীদের দ্বারা একই ধরনের অপরাধের প্রমাণ মিলেছে।

কেন ঘটে এমন মানসিক বিকৃতি?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেক্রোফিলিয়াকে একটি গুরুতর প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার বা অস্বাভাবিক যৌন আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘তাদের মধ্যে এক ধরনের চরম একাকীত্ব, বর্জনের ভয় এবং হীনম্মন্যতা কাজ করে। তারা মনে করে, জীবিত কোনো মানুষের সাথে সম্পর্ক করতে গেলে তারা প্রত্যাখ্যাত হবে। অন্যদিকে মৃত মানুষ কোনো প্রতিবাদ করবে না এবং সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে- এই ফ্যান্টাসি থেকেই তারা এই অপরাধে লিপ্ত হয়।’

আইনের ফাঁকফোকর ও আমাদের করণীয়

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে নেক্রোফিলিয়া বা মৃতকামিতা সংক্রান্ত সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা বা শাস্তির বিধান নেই। ফলে অপরাধীরা ধরা পড়লেও অনেক সময় তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইনজীবীদের মতে, দণ্ডবিধিতে মৃতকামিতার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করলেই এই অপরাধ রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের আধুনিক হাসপাতালের মতো আমাদের দেশের মর্টুয়ারি বা ডোমঘরগুলোতেও সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা ও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা জরুরি।

মৃত্যুর পর একজন মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো উপায় থাকে না। তাই মৃতদেহের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি আমাদের সকলের। মর্গের এই অন্ধকার জগৎ থেকে কুচক্রীদের চিরতরে নির্মূল করতে না পারলে মানবতা বারবার এভাবেই হোঁচট খাবে।

সূত্র: আলাপ এক্সপ্লেইন্স

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

জনপ্রিয় সংবাদ

মৃত্যুর পরও কি নিরাপদ নয় নারীরা?

মর্গে বিভীষিকা: মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার

আপডেট সময় : ৬ ঘন্টা আগে

মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা হয় কবর কিংবা চিতা। সমাজ ও সভ্যতার রীতি অনুযায়ী মৃত মানুষকে সবসময়ই সসম্মানে শেষ বিদায় জানানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- মৃত্যুর পরও কি মানুষ সত্যিই নিরাপদ?

বিশেষ করে সেই মরদেহ যদি হয় কোনো নারীর, তবে মর্গের দরজা বন্ধ হওয়ার পর সেখানে আসলে কী ঘটে? রোববার (১৮ অক্টোবর) ইউটিউব চ্যানেল ‘আলাপ এক্সপ্লেইন্স’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য; যা অত্যন্ত অস্বস্তিকর, অমানবিক এবং বিকৃত মানসিকতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।

মর্গের হিমঘরে নরপিশাচের থাবা

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষস্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন থানা ও আশুলিয়া এলাকার মৃতদেহগুলোর ময়নাতদন্ত এখানেই হয়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেরি হলে পরিচয়হীন বা বেওয়ারিশ মরদেহগুলো রাখা হয় মর্গের হিমঘরে। আর এই হিমঘরকেই নিজেদের লালসা চরিতার্থ করার জন্য বেছে নিয়েছে কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা উত্তর সিটির একটি বাড়ি থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলা হলেও, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও সিআইডির ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ে তার শরীরে পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি মেলে!

একই ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসেও। সেবারও অন্য এক নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের পর সিআইডির পরীক্ষায় একাধিক পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, মর্গের তৎকালীন ডোম বা কর্মচারীরাই এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

২০১৯ সালের পুনরাবৃত্তি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

মর্গে এমন বিকৃত যৌনাচার বা নেক্রোফিলিয়া বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৯ সালে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে মুন্না ভগত নামে এক সহকারী বা ডোমের বিরুদ্ধে একাধিক মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের প্রমাণ পেয়েছিল সিআইডি।

মুন্না ছিলেন তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালের ভাগ্নে এবং তার হাত ধরেই তার নিয়োগ হয়েছিল। সেই সময় যতনলাল গ্রেফতার হলেও পরবর্তীকালে জামিনে বেরিয়ে আসেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে মর্গ প্রধানের সহকারী নূরে আলম শান্ত ও তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নাম। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ আগেই নষ্ট করে ফেলা হলেও, সিআইডির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং ডিএনএ ম্যাচিংয়ে অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। এমনকি হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রতিবাদ করলে এই সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে তাদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সিআইডির তদন্তে জানা গেছে, শুধু ঢাকা নয়- এর আগে ২০২১ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও মর্গের কর্মচারীদের দ্বারা একই ধরনের অপরাধের প্রমাণ মিলেছে।

কেন ঘটে এমন মানসিক বিকৃতি?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেক্রোফিলিয়াকে একটি গুরুতর প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার বা অস্বাভাবিক যৌন আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘তাদের মধ্যে এক ধরনের চরম একাকীত্ব, বর্জনের ভয় এবং হীনম্মন্যতা কাজ করে। তারা মনে করে, জীবিত কোনো মানুষের সাথে সম্পর্ক করতে গেলে তারা প্রত্যাখ্যাত হবে। অন্যদিকে মৃত মানুষ কোনো প্রতিবাদ করবে না এবং সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে- এই ফ্যান্টাসি থেকেই তারা এই অপরাধে লিপ্ত হয়।’

আইনের ফাঁকফোকর ও আমাদের করণীয়

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে নেক্রোফিলিয়া বা মৃতকামিতা সংক্রান্ত সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা বা শাস্তির বিধান নেই। ফলে অপরাধীরা ধরা পড়লেও অনেক সময় তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইনজীবীদের মতে, দণ্ডবিধিতে মৃতকামিতার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করলেই এই অপরাধ রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের আধুনিক হাসপাতালের মতো আমাদের দেশের মর্টুয়ারি বা ডোমঘরগুলোতেও সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা ও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা জরুরি।

মৃত্যুর পর একজন মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো উপায় থাকে না। তাই মৃতদেহের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি আমাদের সকলের। মর্গের এই অন্ধকার জগৎ থেকে কুচক্রীদের চিরতরে নির্মূল করতে না পারলে মানবতা বারবার এভাবেই হোঁচট খাবে।

সূত্র: আলাপ এক্সপ্লেইন্স