ঢাকা , শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ডিম-মুরগির দামে স্বস্তি নেই, চড়া মাছের বাজারও নুসরাত ফারিয়ার নতুন চ্যালেঞ্জ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ অভিষেকে বড় জয় কোমোর, লাইপজিগকে উড়িয়ে দিল ৪-১ গোলে ১ যুদ্ধের শত ক্ষত চট্টগ্রামে ট্রেনের ধাক্কায় আহত শিশুটিও মারা গেছে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ প্রতিরোধে দরকার সাংস্কৃতিক উদ্যোগ: জামায়াত আমির নিজ আসনে ধর্মীয়-সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান ‘মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী’ সখিপুরে সন্দেহ ভাজন যুবককে ধরিয়ে দিতে পুলিশের পুরস্কার ঘোষণা লালমনিহাট জেলার গাঁজা উবনি হামিদুল ও রাসেল ১৩ কেজি গাঁজাসহ বগুড়ায় গ্রেফতার

১ যুদ্ধের শত ক্ষত




২৫ বছর আগের সেই দিনটির কথা ভাবলে আজও থমকে যায় পৃথিবী। ১৯ জন আল-কায়েদা সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে আছড়ে পড়েছিল আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার আর পেন্টাগনে। প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণ নিভে গিয়েছিল নিমেষেই। কিন্তু সেই অগ্নিকুণ্ড থেকে যে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠেছিল, তা ২৫ বছর ধরে দগ্ধ করেছে পুরো বিশ্বকে। ২০০১ সালের পর এমন একটি বছরও কাটেনি, যখন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মার্কিন বোমারু বিমান ডানা মেলেনি, কিংবা ছাই হয়ে যায়নি কোনো না কোনো সাধারণ মানুষের স্বপ্ন।

২০০৩ সালে আমেরিকা যখন ইরাকে আক্রমণ চালায়, তখন ওমরের বয়স মাত্র ১৮ বছর। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভুয়া অজুহাতে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি মনে করে ওমর আজও শিউরে ওঠেন; সবকিছু এক মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল। কানে ভেসে আসত শুধু বোমার বিকট শব্দ আর চারপাশের চিৎকার। ওমরের কয়েকজন বন্ধু বাগদাদের রাস্তায় নেমেছিল পরিস্থিতি দেখতে। ওমর বারবার বারণ করেছিলেন, কিন্তু তারা শোনেনি। ওরা গেল, আর কোনো দিন ফিরে এলো না, ওমরের মনে আজও জমে আছে সেই হারানোর তীব্র যন্ত্রণা।

আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকা থেকে শুরু করে ইরাকের তপ্ত মরুভূমি, ইয়েমেন, সোমালিয়া কিংবা পাকিস্তানের গ্রামগুলো; যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। পরিসংখ্যান হয়তো বলে, এসব যুদ্ধে সরাসরি আর পরোক্ষ মিলিয়ে মারা গেছেন প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে ঢাকা পড়ে আছে লাখ লাখ ভাঙা ঘরের গল্প, স্বজনহারা মানুষের কান্না আর অপুষ্টিতে ধুঁকতে থাকা শিশুদের চেহারা।

আফগানিস্তানের ৪০ বছর বয়সী মা আয়েশার জীবনটাই যেন এক ফেরারি গল্প। গত তিন দশকে তিনি কতবার নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়েছেন, তার হিসাব তিনি নিজেও হারিয়ে ফেলেছেন। কখনো তালেবান, কখনো মার্কিন আক্রমণ, আবার কখনো শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় খোঁজা। সবশেষ ইরানে ১১ বছর কাটানোর পর যখন সন্তানদের স্কুল থেকে বের করে দিয়ে তাদের আবারও তাড়িয়ে দেওয়া হলো, তখন আয়েশার উপলব্ধি হয়েছিল; তাদের নিজস্ব বলতে এই পৃথিবীতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

শুধু যাদের ওপর বোমা পড়েছে তারাই নয়, যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন যুদ্ধের পোশাক পরা মানুষরাও। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা মার্কিন সেনাদের বহুজন আজ মানসিক এক গভীর ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের তথ্যমতে, যুদ্ধের ময়দানে যত সেনা মারা গেছেন, তার চেয়ে চার গুণ বেশি সেনা দেশে ফিরে আত্মহত্যা করেছেন। গুলির শব্দ থেমে গেলেও তাদের মনের ভেতরের যুদ্ধটা যে থামেনি!

দুই দশকে এই যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ঢেলেছে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু বন্দুকের নল দিয়ে যে শান্তি কেনা যায় না, আড়াই দশক পর এসে বিশ্ব তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ৯/১১’র সেই অভিশপ্ত দিনের পর শুরু হওয়া এই অনন্তকালের যুদ্ধ বিশ্বকে নিরাপত্তা তো দিতেই পারেনি, বরং উপহার দিয়েছে গৃহহীন লাখ লাখ মানুষ, ধূলিসাৎ হওয়া শহর আর কখনো না শুকাতে যাওয়া হাজারো মানবিক ক্ষত।

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

জনপ্রিয় সংবাদ

ডিম-মুরগির দামে স্বস্তি নেই, চড়া মাছের বাজারও

১ যুদ্ধের শত ক্ষত

আপডেট সময় : ১০ ঘন্টা আগে

২৫ বছর আগের সেই দিনটির কথা ভাবলে আজও থমকে যায় পৃথিবী। ১৯ জন আল-কায়েদা সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে আছড়ে পড়েছিল আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার আর পেন্টাগনে। প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণ নিভে গিয়েছিল নিমেষেই। কিন্তু সেই অগ্নিকুণ্ড থেকে যে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠেছিল, তা ২৫ বছর ধরে দগ্ধ করেছে পুরো বিশ্বকে। ২০০১ সালের পর এমন একটি বছরও কাটেনি, যখন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মার্কিন বোমারু বিমান ডানা মেলেনি, কিংবা ছাই হয়ে যায়নি কোনো না কোনো সাধারণ মানুষের স্বপ্ন।

২০০৩ সালে আমেরিকা যখন ইরাকে আক্রমণ চালায়, তখন ওমরের বয়স মাত্র ১৮ বছর। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভুয়া অজুহাতে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি মনে করে ওমর আজও শিউরে ওঠেন; সবকিছু এক মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল। কানে ভেসে আসত শুধু বোমার বিকট শব্দ আর চারপাশের চিৎকার। ওমরের কয়েকজন বন্ধু বাগদাদের রাস্তায় নেমেছিল পরিস্থিতি দেখতে। ওমর বারবার বারণ করেছিলেন, কিন্তু তারা শোনেনি। ওরা গেল, আর কোনো দিন ফিরে এলো না, ওমরের মনে আজও জমে আছে সেই হারানোর তীব্র যন্ত্রণা।

আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকা থেকে শুরু করে ইরাকের তপ্ত মরুভূমি, ইয়েমেন, সোমালিয়া কিংবা পাকিস্তানের গ্রামগুলো; যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। পরিসংখ্যান হয়তো বলে, এসব যুদ্ধে সরাসরি আর পরোক্ষ মিলিয়ে মারা গেছেন প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে ঢাকা পড়ে আছে লাখ লাখ ভাঙা ঘরের গল্প, স্বজনহারা মানুষের কান্না আর অপুষ্টিতে ধুঁকতে থাকা শিশুদের চেহারা।

আফগানিস্তানের ৪০ বছর বয়সী মা আয়েশার জীবনটাই যেন এক ফেরারি গল্প। গত তিন দশকে তিনি কতবার নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়েছেন, তার হিসাব তিনি নিজেও হারিয়ে ফেলেছেন। কখনো তালেবান, কখনো মার্কিন আক্রমণ, আবার কখনো শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় খোঁজা। সবশেষ ইরানে ১১ বছর কাটানোর পর যখন সন্তানদের স্কুল থেকে বের করে দিয়ে তাদের আবারও তাড়িয়ে দেওয়া হলো, তখন আয়েশার উপলব্ধি হয়েছিল; তাদের নিজস্ব বলতে এই পৃথিবীতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

শুধু যাদের ওপর বোমা পড়েছে তারাই নয়, যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন যুদ্ধের পোশাক পরা মানুষরাও। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা মার্কিন সেনাদের বহুজন আজ মানসিক এক গভীর ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের তথ্যমতে, যুদ্ধের ময়দানে যত সেনা মারা গেছেন, তার চেয়ে চার গুণ বেশি সেনা দেশে ফিরে আত্মহত্যা করেছেন। গুলির শব্দ থেমে গেলেও তাদের মনের ভেতরের যুদ্ধটা যে থামেনি!

দুই দশকে এই যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ঢেলেছে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু বন্দুকের নল দিয়ে যে শান্তি কেনা যায় না, আড়াই দশক পর এসে বিশ্ব তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ৯/১১’র সেই অভিশপ্ত দিনের পর শুরু হওয়া এই অনন্তকালের যুদ্ধ বিশ্বকে নিরাপত্তা তো দিতেই পারেনি, বরং উপহার দিয়েছে গৃহহীন লাখ লাখ মানুষ, ধূলিসাৎ হওয়া শহর আর কখনো না শুকাতে যাওয়া হাজারো মানবিক ক্ষত।