‘আমি একজন শিক্ষক ছিলাম। আমার হাতে গড়ে উঠেছে কতশত ছাত্রছাত্রীর জীবন। অন্যের সন্তানকে মানুষ করতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। কিন্তু আজ নিজের সন্তানদের কাছেই আমি অসহায়। যাদের জন্য জীবনের সবটুকু ত্যাগ করেছি, বৃদ্ধ বয়সে তাদের কাছেই যেন আমি বোঝা।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ৮০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রহিমা খাতুন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গড়ার কারিগর এই নারী জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকিত্ব ও অসহায়ত্বের মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
ময়মনসিংহ নগরের ভাটিকাশর এলাকায় নিজের পাঁচতলা বাড়িতে একাই থাকেন রহিমা খাতুন। শিক্ষক দিবসে তার জীবনকাহিনি যেন সমাজের সামনে এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যে মা একসময় শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে অন্যের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, সেই মা-ই আজ নিজের সন্তানদের কাছ থেকে একটু ভালোবাসা, সহায়তা ও দেখাশোনার আশায় দিন কাটাচ্ছেন।
রহিমা খাতুন জানান, তিনি দীর্ঘ ২৪ বছর ২ মাস শিক্ষকতা করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭২ সালে নাসিরাবাদ গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। বিয়ের পর কয়েক বছর শিক্ষকতা থেকে বিরত থাকলেও ১৯৮৫ সালে সানফ্লাওয়ার স্কুলে আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর ২০০৯ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন তিনি।
রহিমা খাতুন বলেন, ‘শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু চাকরি ছিল না। এটা ছিল মানুষের জীবন গড়ার দায়িত্ব। কত ছেলেমেয়ে আমার কাছে পড়েছে, কতজন আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
অন্যের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে পারলেও তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন ভিন্ন এক বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে।
রহিমা খাতুনের দুই মেয়ে ফারজানা সুলতানা কাবেরী ও ফারহানা সুলতানা সুমি। তার দাবি, মেয়েরা ছোট থাকতেই তাদের বাবা ও তার স্বামী আবু তাহের আকন্দ সংসার ছেড়ে চলে যান। এরপর দুই মেয়ের দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেন।
একদিকে শিক্ষকতা, অন্যদিকে দুই শিশুকন্যার লালন-পালন, দুই দায়িত্বই সামলাতে হয়েছে তাকে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের সুখ-শান্তির কথা ভুলে কঠোর পরিশ্রম করেছেন বলে জানান তিনি।
রহিমা খাতুন বলেন, ‘ওদের ছোটবেলা থেকে নিজের হাতে মানুষ করেছি। নিজের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা করিনি। আমার সন্তানরা যেন ভালো থাকে, পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয় এটাই ছিল আমার স্বপ্ন। নিজের জীবনের অনেক কিছু বিসর্জন দিয়েছি তাদের জন্য।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই মেয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন। তাদের সংসারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক মেয়ের জামাতা সচিব এবং অন্য মেয়ের জামাতা প্রকৌশলী। অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়িসহ তাদের জীবন স্বচ্ছল হলেও নিজের জীবনে নেমে এসেছে নিঃসঙ্গতা এমনটাই অভিযোগ রহিমা খাতুনের।
তিনি বলেন, ‘আজ আমার নিজের বলতে কেউ নেই। আমি অসহায় হয়ে পড়েছি। আমার দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। যে সন্তানদের জন্য জীবনের সবকিছু করেছি, আজ তাদের কাছেই আমি অসহায়।’
রহিমা খাতুন আরও অভিযোগ করেন, তার নামে থাকা সম্পত্তি ও সম্পদও বিভিন্নভাবে লিখে নেওয়া হয়েছে। ফলে জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার নামে যা ছিল, সেগুলোও লিখে নেওয়া হয়েছে। এখন আমার হাতে কী আছে? বয়স ৮০ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। জানি না আর কতদিন বাঁচব। জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন অবস্থায় পড়তে হবে, কখনো ভাবিনি।’
কথা বলার সময় বারবার চোখের পানি মুছছিলেন রহিমা খাতুন। দীর্ঘ জীবনের ত্যাগ, অভিমান আর একাকিত্ব যেন তার প্রতিটি কথায় ফুটে উঠছিল।
তিনি বলেন, ‘বুড়ো বয়সে সন্তানদের পাশে থাকব, তাদের সংসারে একটু আশ্রয় পাব এটাই তো একজন মায়ের স্বাভাবিক আশা। কিন্তু আমার সেই আশা পূরণ হয়নি। একা একা থাকা কতটা কষ্টের, সেটা কাউকে বোঝানো যাবে না।’
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দিয়েছেন রহিমা খাতুন। তাদের জীবনের পথ দেখিয়েছেন, ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করেছেন। অথচ আজ নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি চান শুধু একটু নিরাপত্তা, সঙ্গ ও আপনজনের ভালোবাসা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি আর বেশি কিছু চাই না। শুধু চাই, বৃদ্ধ বয়সে যেন একা থাকতে না হয়। কেউ যেন আমার পাশে থাকে, একটু খোঁজ নেয়। সন্তানদের জন্য সারা জীবন দিয়েছি। জীবনের শেষ সময়ে অন্তত একটু ভালোবাসা ও আশ্রয় চাই।’
রহিমা খাতুনের পরিচিত দিলারা বেগম বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করেছি। রহিমাকে আমার চোখের সামনে দেখেছি। তিনি শিক্ষকতা করে কত কষ্টে তার দুই মেয়েকে মানুষ করেছেন। নিজের সুখ-শান্তির কথা না ভেবে সারাজীবন সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অথচ আজ সেই বৃদ্ধ মাকেই একা ফেলে রেখেছে তার দুই মেয়ে। বৃদ্ধ বয়সে তিনি একাই বাসায় থাকেন, দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। মেয়েরাও নিয়মিত খোঁজখবর নেয় না। বিষয়টি সত্যিই খুব কষ্টের ও হৃদয়বিদারক। যে মা সারাজীবন সন্তানদের জন্য ত্যাগ করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে তার এমন একাকী ও অসহায় জীবন মেনে নেওয়া কঠিন।’
ত্রিশাল বালিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘শেষ বয়সে পিতা-মাতাকে যে সন্তান দেখে না, তার চেয়ে নিকৃষ্ট আর কেউ নেই।’
তিনি বলেন, ‘পিতা-মাতা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ও সুখ বিসর্জন দেন। অথচ বয়সের ভারে যখন তারা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তাদের অবহেলা করা অত্যন্ত দুঃখজনক। বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়; তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান এবং একটু সময়।’
আব্দুস সাত্তার আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের শিক্ষা দিলেই হবে না, তাদের নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষাও দিতে হবে। কারণ বৃদ্ধ পিতা-মাতার পাশে দাঁড়ানোও একজন সন্তানের অন্যতম বড় দায়িত্ব।’

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি 





















