জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এর তীব্র বিরোধিতা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইসলামী ঐক্যজোট। সম্পত্তি দান বা হেবা করার পরেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেটি ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন—এমন বিধান রেখে পাস হওয়া এই আইনটি মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের ব্যত্যয় ঘটাবে এবং পারিবারিক ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করবে বলে দাবি করেছে দলটি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘হেবা করে দেওয়ার পর যদি সন্তান বাবা-মায়ের দেখাশোনা না করে, তখন মা-বাবার অবস্থা কী হবে? বাস্তবেও এমন হচ্ছে—সন্তানরা বাবা-মায়ের সম্পত্তি পাওয়ার পর বাবা-মাকেই সেখান থেকে উচ্ছেদ করে দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‘এই সমস্যার সমাধানের জন্যই আইনটি সংশোধন করা হয়েছে।’’
তবে এর বিপরীতে প্রশ্ন উত্থাপন করে মুফতি সাখাওয়াত বলেন, ‘বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সন্তান এমনিতেই তো সম্পত্তির মালিক হবে, তাহলে জীবিত অবস্থায় হেবা করতে হবে কেন?’
তিনি উল্লেখ করেন, ভোগদখলের অধিকার নিজের কাছে রেখে সম্পত্তি হেবা করে দিলেও পরবর্তীতে বাবা-মায়ের চিকিৎসা বা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত অর্থের দরকার হলে এবং সম্পত্তির অংশ বিক্রি করতে চাইলে তারা তা পারবেন না। কারণ, মালিকানা ইতিমধ্যে সন্তানের নামে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। ফলে আইন সংশোধন সত্ত্বেও বাবা-মায়ের অর্থনৈতিক বিপদের ঝুঁকি থেকেই যায়।
আইনটি শরিয়ত সম্মত নয় দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের আলেম সমাজ শরিয়তের আলোকে এমন শর্তযুক্ত হেবাকে গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না। অতীতে আইয়ুব খানের ১৯৬১ সালের প্রত্যাখ্যাত মুসলিম পারিবারিক আইনের রেফারেন্স দেওয়া হলেও আলেমদের বিরোধিতার মুখে তা শেষ পর্যন্ত কার্যকরভাবে টেকেনি। ফলে এই আইনটিও আলেমদের আপত্তির কারণে বাস্তব প্রয়োগ ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।
ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিবের মতে, এই সংশোধিত আইনের মাধ্যমে মূলত মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের স্বাভাবিক ব্যত্যয় ঘটবে। বিশেষ করে, শুধুমাত্র কন্যাসন্তান রেখে কেউ মারা গেলে তার ভাই কিংবা ভাতিজারা যে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারত, এই আইন সেই স্বাভাবিক উত্তরাধিকার নীতিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এছাড়া, যখন ভোগদখলের সুযোগ সংরক্ষিত থাকে, তখন অনেক সময় বাবা-মা আবেগপ্রবণ হয়ে কিংবা রাগের বশে নিজের কোনো সন্তানকে বঞ্চিত করে অন্য সন্তানকে সমস্ত সম্পত্তি লিখে দেওয়ার নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
ইসলামের সামগ্রিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে শুধু সম্পত্তি হস্তান্তরের সংকীর্ণ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইচ্ছা হিসেবে না দেখে একে পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক কল্যাণের মেলবন্ধন হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘শুধুমাত্র কন্যাসন্তান রেখে কেউ মারা গেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির ভাই বা ভাতিজা অবশিষ্ট সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে। এর সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্ববোধও জড়িত।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, কোনো দরিদ্র ব্যক্তি একমাত্র কন্যাকে নিঃস্ব অবস্থায় রেখে মারা গেলে ওই ভাই বা ভাতিজার ওপর সেই কন্যার ভরণপোষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব বর্তাতে পারে। তারা দায়িত্ব পালন না করলে কন্যাটি আরও অসহায় হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে আইনি বৈধতা দিতে গিয়ে যদি কোনো বৈধ শরিয়াহ অংশীদারকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তা উত্তরাধিকার ব্যবস্থার স্বাভাবিক কাঠামো ও ভারসাম্যকে নষ্ট করবে।
বিবৃতিতে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ মহলের পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, দাদার সম্পত্তিতে নাতির অধিকার এবং শুধু কন্যাসন্তান থাকলে পুরো সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার যে দাবি তোলা হচ্ছে, হেবা আইন সংশোধনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সেই দাবিগুলোই ভিন্ন উপায়ে বাস্তবায়নের একটি চক্রান্ত করা হচ্ছে। আলেম সমাজ মনে করে, এটি পরোক্ষভাবে সব ধর্মের নিজস্ব উত্তরাধিকার নীতিকেও স্পর্শ ও ব্যাহত করবে।

চলনবিলের সময় ডেস্ক 























