ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকির দায়িত্ব মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ)। এ প্রতিষ্ঠানের কিছু নিয়োগে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে তদন্তে। তবে সরকারি চাকরির শর্ত ভেঙে নিয়োগের প্রমাণ পাওয়ার পরও দুই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে দুই রকম সিদ্ধান্ত। প্রায় একই ধরনের অপরাধ করে একজন পেয়েছেন দায়মুক্তি, অন্যজন পেয়েছেন শাস্তি। এক কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। অপরজনকে ঘটনা ‘দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে’—এ অজুহাত দেখিয়ে দায়মুক্তি দিয়ে রাখা হয়েছে চাকরিতে। এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমআরএ বোর্ড।
জানা গেছে, এমআরএর অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ৮ জন সদস্য থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন মাত্র পাঁচজন। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, বিভাগীয় মামলার কাগজপত্র, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লিখিত মতামত এবং এমআরএ পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার নিয়োগের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ থাকলেও সেসব অভিযোগের নিষ্পত্তিতে রয়েছে বিস্তর বৈপরীত্য।
সবচেয়ে আলোচিত দুটি নিয়োগ হলো নির্বাহী পরিচালক নূরে আলম মেহেদী ও নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ মাজেদুল হকের নিয়োগ। জানা গেছে, ২০১০ সালে এমআরএতে সরাসরি উপপরিচালক পদে নিয়োগের সময় নির্দিষ্ট ধরনের চাকরির অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল। সেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নূরে আলম মেহেদীর অভিজ্ঞতার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার পদে চাকরির অভিজ্ঞতাকে সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকরির অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখিয়ে এমআরএতে আবেদন করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন পর তদন্ত শুরু করে এমআরএ। তদন্তের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মতামত নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ওই মতামতে জানানো হয়, কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ওই পদটি সরকারি চাকরি ছিল না।
এরপর বিষয়টি শুধু অভিযোগের পর্যায়ে থাকেনি। এমআরএর নিজস্ব অফিস আদেশে বলা হয়, নিয়োগের ক্ষেত্রে তথ্য উপস্থাপনের বিষয়টি কর্মচারী চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণ ও প্রতারণার আওতায় পড়ে। ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
অর্থাৎ, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতামত নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বিধিমালা অনুযায়ী অভিযোগের ধরন নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর বিভাগীয় মামলাও হয়েছে।
চলতি বছরের ১৯ মে ব্যক্তিগত শুনানিতে নূরে আলম মেহেদীর দেওয়া বক্তব্য ও তথ্য-প্রমাণ এমআরএ পরিচালনা বোর্ডে উপস্থাপন করা হয়। গত ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত এমআরএর বোর্ডের ৮২তম সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় বোর্ড মত দেয়, তৎকালীন নিয়োগ কর্তৃপক্ষ যথাযথ যাচাই-বাছাই না করেই নূরে আলম মেহেদীকে নিয়োগ দিয়েছিল। অর্থাৎ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই হয়নি—বোর্ড নিজেই সেই দুর্বলতা স্বীকার করেছে। এর পরও অভিযোগের দায় ব্যক্তির ওপর না দিয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার যুক্তি সামনে এনে নূরে আলম মেহেদীকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বোর্ডের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, এত বছর পর তাকে শাস্তি দেওয়া সমীচীন হবে না। ফলে তাকে অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিয়ে স্বীয় পদে বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলাও নিষ্পত্তি করা হয়। এমআরএর অপর নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ মাজেদুল হকের নিয়োগের সময় অভিজ্ঞতা ও চাকরির শ্রেণি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরাসরি উপপরিচালক পদে নিয়োগের সময় তিনি একটি চাকরির অভিজ্ঞতাকে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি উপবৃত্তি প্রকল্পের মনিটরিং পদে চাকরির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু মূল প্রজ্ঞাপন, পরবর্তী গেজেট এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় উঠে আসে ভিন্ন তথ্য।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, তিনি যে সময়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছেন, সে সময় পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের এপ্রিলে পদটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়।
অর্থাৎ, দ্বিতীয় শ্রেণির একটি পদকে প্রথম শ্রেণির চাকরি হিসেবে দেখিয়ে অভিজ্ঞতা উপস্থাপনের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগ আমলে নিয়ে এমআরএ তাকে ছুটিতে পাঠায়। এখানেই দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখছেন এমআরএর সংশ্লিষ্টরা।
এক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে অভিযোগের পর বিভাগীয় মামলা হলেও বোর্ডের সিদ্ধান্তে দায়মুক্তি। অন্য কর্মকর্তার ক্ষেত্রে একই ধরনের নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগে ছুটি। প্রশ্ন উঠেছে— তাহলে এমআরএতে কি একই অভিযোগের জন্য একাধিক বিচারব্যবস্থা চালু আছে।
নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এমআরএর যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ শাহজালালের বিরুদ্ধেও।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুসারে আবেদনের শেষ তারিখে তার চার বছরের অভিজ্ঞতা থাকার কথা থাকলেও মুহাম্মদ শাহজালালের ছিল মাত্র তিন বছর ছয় মাস। বাকি ছয় মাসের ঘাটতি পূরণে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতাকে সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ রয়েছে।
শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, নিয়োগ পরীক্ষার নম্বর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় নম্বর না পেলেও তাকে উত্তীর্ণ করানো হয়েছিল। নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে নতুন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়ার নামে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
একপর্যায়ে এসব অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত এগোনোর সময় তদন্ত কমিটির সদস্যের বিরুদ্ধেই পাল্টা অভিযোগ ওঠে।
এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে কালবেলা প্রতিবেদক মুহাম্মদ শাহজালালের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
একই ধরনের অভিযোগে একজনকে ছুটিতে পাঠানো, অন্যজনকে বহাল রাখা এবং আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি না হওয়ায় এমআরএর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়টি নিয়ে এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্য ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কালবেলাকে বলেন, আমি দেশের বাইরে আছি। বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। তবে এ ব্যাপারে এমআরএ সাবেক কর্মকর্তা ও পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের দায় রয়েছে।
এমআরএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—সেটি নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারিত হওয়া জরুরি। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
নথি বলছে, একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিভাগীয় মামলা হয়েছে। আবার বোর্ডের সিদ্ধান্তে সেই অভিযোগ থেকে তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ওই ধরনের অভিযোগে আরেক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এমআরএতে অপরাধের বিচার হয় অভিযোগের ধরন দেখে, নাকি অভিযুক্তের পরিচয় দেখে।
প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সনদ প্রদান, স্থগিত ও বাতিল করতে পারে। সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম পরিবীক্ষণ, তদারকি ও সরেজমিনে পরিদর্শন করা, বিধিবিধান ও সার্কুলার জারিসহ বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে থাকে। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানটি সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিশেষ করে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্পৃক্তকরণের কাজ করে থাকে। বর্তমানে এমআরএর সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সদস্য সংখ্যা ৪ কোটি ১৫ লাখের বেশি। সারা দেশে এর শাখা রয়েছে প্রায় ২৮ হাজার।

চলনবিলের সময় ডেস্ক 

























