ঢাকা , শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বগুড়ায় শিবগঞ্জ উপজেলা প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত বৃদ্ধার মৃত্যু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বিকল্প পরিকল্পনা দিন, বিরোধী দলকে রিজভী সনাতনীদের ‘ভোট ব্যাংক’ ভাবার ধারণা ভেঙে দেওয়া হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মালেকের মৃত্যু ঘিরে হামলা-মামলা: সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অপূর্বই ‘বাংলাদেশের উত্তম কুমার’, বললেন মহানায়কের ভাতিজি এলএনজি আমদানিতে স্পট মার্কেটেই ভরসা, বাড়ছে ব্যয় ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ বয়স জালিয়াতি করে বিশ্বকাপ জয়, নিষিদ্ধ ভারতীয় ক্রিকেটার তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দিল্লির বার্তা, ‘নতুন তথ্য নেই’ মোকামতলা উপজেলায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত
আগস্টে পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি

এলএনজি আমদানিতে স্পট মার্কেটেই ভরসা, বাড়ছে ব্যয়




ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত (ফোর্স ম্যাজিউর) করেছে কাতার। এমন পরিস্থিতিতে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এরই মধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য চার কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে এবং একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হবে। এসব কার্গো কিনতে ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস কাতার। ওমানের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক স্থিতিশীল ও কম দামে দীর্ঘ সময় গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সেই সুবিধা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে কাতার সরবরাহ সীমিত করে। জুলাইয়ে একটি কার্গো এলেও নিয়মিত সরবরাহ আর স্বাভাবিক হয়নি। সর্বশেষ কাতার আগামী নভেম্বর পর্যন্ত অনিবার্য পরিস্থিতির কথা জানিয়ে সরবরাহে বিলম্বের মেয়াদ বাড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে; কিন্তু সেখানেও পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্যানুযায়ী, ৮-৯ সেপ্টেম্বর এবং ১-২ অক্টোবর সরবরাহের জন্য আহ্বান করা দুটি কার্গোর বিপরীতে কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো প্রস্তাব দেয়নি।

দুই মাস ধরে চলা গ্যাস সংকটে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জুলাই ও আগস্টে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমে যায়। পরে টার্মিনাল চালু হলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে কমেছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। ৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ব্ল্যাক কিউব ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখনো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া ওই সময়ের জন্য দুই দফা স্পট দরপত্র আহ্বান করেও কোনো সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। ফলে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহে রেশনিং অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২৩৩ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় খাত থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১৬১ কোটি ৮ লাখ ঘনফুট ও এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৭১ কোটি ২ লাখ ঘনফুট গ্যাস।

পুনঃদরপত্রে লোকসান কম দামে গ্যাস পাওয়ার আশায় আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ১২৩ কোটি টাকারও বেশি। জ্বালানি বিভাগের সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার প্রত্যাশায় দুটি কার্গোর আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে উল্টো সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের কার্গোর জন্য গত সোমবারের দরপত্রে বিপি সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম চেয়েছিল ২৫ দশমিক ৬২ ডলার। দাম বেশি মনে হওয়ায় সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। পরে পুনঃদরপত্রে একই সময়ের কার্গোর সর্বনিম্ন দর আসে ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার। এতে শুধু এই কার্গোতেই সরকারের বাড়তি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার বা প্রায় ৮০ কোটি টাকা।

একইভাবে ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের কার্গোর জন্য আগের দরপত্রে ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট প্রায় ২৫ দশমিক ৫ ডলার দর দিয়েছিল। পুনঃদরপত্রে একই প্রতিষ্ঠান দর বাড়িয়ে ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলার করে। ফলে এই কার্গোতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৩০ লাখ ডলার বা ৩৭ কোটি টাকার মতো। সব মিলিয়ে দুটি কার্গোর ক্ষেত্রেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক কোটি ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৩ কোটি টাকার সমান।

সাম্প্রতিক সময়ের এলএনজি আমদানির দামের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। গত ২৪ আগস্ট অনুমোদিত দুই কার্গোর দাম ছিল যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৬২ ডলার ও ২৪ দশমিক ২৫ ডলার। এর আগে ১৯ আগস্ট কেনা একটি কার্গোর দাম ছিল ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার।

অথচ এবার স্পট মার্কেট থেকে কেনা তিনটি কার্গোর দাম ২৬ দশমিক ৬৭ ডলার থেকে ২৮ দশমিক ০৩ ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম সর্বোচ্চ প্রায় চার ডলার বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে আমদানি ব্যয়েও। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি কার্গো কিনতে ব্যয় হয়েছিল ৯৪৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। এখন সেই ব্যয় বেড়ে এক হাজার ১৩০ থেকে এক হাজার ১৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বাড়ছে ভর্তুকি বর্তমানে প্রতি মাসে দেশে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি কার্গোই স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে। প্রতিটি কার্গোর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। অথচ সেই গ্যাস বিক্রি করে সরকার আয় করছে মাত্র ৩৫০ কোটি টাকার মতো।অর্থাৎ প্রতি কার্গোতেই লোকসান হচ্ছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। আগস্ট মাসের এলএনজি আমদানির জন্য সরকার ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর মাসে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলারের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশকে ২৬ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত দামে কার্গো কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে অল্প সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে কিছুটা বেশি দাম স্বাভাবিক হলেও ২ থেকে ৩ ডলারের এই অতিরিক্ত ব্যবধান আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে।

বর্তমানে দেশি ও আমদানিকৃত গ্যাস মিলিয়ে মিশ্রিত গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ৪৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ছয় মাস আগে এই ব্যয় ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। অথচ সরকার গ্যাস বিক্রি করছে গড়ে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সরকারের লোকসান হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, কাতার ও ওমানের সরবরাহ সংকট এবং স্পট মার্কেটের উচ্চমূল্যের কারণে চলতি অর্থবছরে সেই লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরপিজিসিএলের এলএনজি ডিভিশনের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, কাতারের কার্গো ফোর্স ম্যাজিউরের পর স্পট মার্কেটের ওপর জোর বাড়াতে হয়েছে। সে অনুযায়ী দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ করছি।

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

বগুড়ায় শিবগঞ্জ উপজেলা প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত বৃদ্ধার মৃত্যু

আগস্টে পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি

এলএনজি আমদানিতে স্পট মার্কেটেই ভরসা, বাড়ছে ব্যয়

আপডেট সময় : ১২ ঘন্টা আগে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত (ফোর্স ম্যাজিউর) করেছে কাতার। এমন পরিস্থিতিতে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এরই মধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য চার কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে এবং একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হবে। এসব কার্গো কিনতে ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস কাতার। ওমানের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক স্থিতিশীল ও কম দামে দীর্ঘ সময় গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সেই সুবিধা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে কাতার সরবরাহ সীমিত করে। জুলাইয়ে একটি কার্গো এলেও নিয়মিত সরবরাহ আর স্বাভাবিক হয়নি। সর্বশেষ কাতার আগামী নভেম্বর পর্যন্ত অনিবার্য পরিস্থিতির কথা জানিয়ে সরবরাহে বিলম্বের মেয়াদ বাড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে; কিন্তু সেখানেও পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্যানুযায়ী, ৮-৯ সেপ্টেম্বর এবং ১-২ অক্টোবর সরবরাহের জন্য আহ্বান করা দুটি কার্গোর বিপরীতে কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো প্রস্তাব দেয়নি।

দুই মাস ধরে চলা গ্যাস সংকটে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জুলাই ও আগস্টে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমে যায়। পরে টার্মিনাল চালু হলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে কমেছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। ৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ব্ল্যাক কিউব ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখনো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া ওই সময়ের জন্য দুই দফা স্পট দরপত্র আহ্বান করেও কোনো সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। ফলে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহে রেশনিং অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২৩৩ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় খাত থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১৬১ কোটি ৮ লাখ ঘনফুট ও এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৭১ কোটি ২ লাখ ঘনফুট গ্যাস।

পুনঃদরপত্রে লোকসান কম দামে গ্যাস পাওয়ার আশায় আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ১২৩ কোটি টাকারও বেশি। জ্বালানি বিভাগের সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার প্রত্যাশায় দুটি কার্গোর আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে উল্টো সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের কার্গোর জন্য গত সোমবারের দরপত্রে বিপি সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম চেয়েছিল ২৫ দশমিক ৬২ ডলার। দাম বেশি মনে হওয়ায় সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। পরে পুনঃদরপত্রে একই সময়ের কার্গোর সর্বনিম্ন দর আসে ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার। এতে শুধু এই কার্গোতেই সরকারের বাড়তি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার বা প্রায় ৮০ কোটি টাকা।

একইভাবে ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের কার্গোর জন্য আগের দরপত্রে ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট প্রায় ২৫ দশমিক ৫ ডলার দর দিয়েছিল। পুনঃদরপত্রে একই প্রতিষ্ঠান দর বাড়িয়ে ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলার করে। ফলে এই কার্গোতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৩০ লাখ ডলার বা ৩৭ কোটি টাকার মতো। সব মিলিয়ে দুটি কার্গোর ক্ষেত্রেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক কোটি ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৩ কোটি টাকার সমান।

সাম্প্রতিক সময়ের এলএনজি আমদানির দামের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। গত ২৪ আগস্ট অনুমোদিত দুই কার্গোর দাম ছিল যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৬২ ডলার ও ২৪ দশমিক ২৫ ডলার। এর আগে ১৯ আগস্ট কেনা একটি কার্গোর দাম ছিল ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার।

অথচ এবার স্পট মার্কেট থেকে কেনা তিনটি কার্গোর দাম ২৬ দশমিক ৬৭ ডলার থেকে ২৮ দশমিক ০৩ ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম সর্বোচ্চ প্রায় চার ডলার বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে আমদানি ব্যয়েও। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি কার্গো কিনতে ব্যয় হয়েছিল ৯৪৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। এখন সেই ব্যয় বেড়ে এক হাজার ১৩০ থেকে এক হাজার ১৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বাড়ছে ভর্তুকি বর্তমানে প্রতি মাসে দেশে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি কার্গোই স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে। প্রতিটি কার্গোর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। অথচ সেই গ্যাস বিক্রি করে সরকার আয় করছে মাত্র ৩৫০ কোটি টাকার মতো।অর্থাৎ প্রতি কার্গোতেই লোকসান হচ্ছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। আগস্ট মাসের এলএনজি আমদানির জন্য সরকার ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর মাসে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলারের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশকে ২৬ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত দামে কার্গো কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে অল্প সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে কিছুটা বেশি দাম স্বাভাবিক হলেও ২ থেকে ৩ ডলারের এই অতিরিক্ত ব্যবধান আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে।

বর্তমানে দেশি ও আমদানিকৃত গ্যাস মিলিয়ে মিশ্রিত গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ৪৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ছয় মাস আগে এই ব্যয় ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। অথচ সরকার গ্যাস বিক্রি করছে গড়ে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সরকারের লোকসান হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, কাতার ও ওমানের সরবরাহ সংকট এবং স্পট মার্কেটের উচ্চমূল্যের কারণে চলতি অর্থবছরে সেই লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরপিজিসিএলের এলএনজি ডিভিশনের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, কাতারের কার্গো ফোর্স ম্যাজিউরের পর স্পট মার্কেটের ওপর জোর বাড়াতে হয়েছে। সে অনুযায়ী দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ করছি।