নেপালে তীর্থযাত্রায় গিয়ে ভয়াবহ বন্যা ও তুষারধসের কবলে পড়েছিলেন তামিলনাড়ুর ২১ জন তীর্থযাত্রী। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) তারা চেন্নাইয়ে ফিরে আসেন। তাদের অনেকেই বলছেন, এই ফিরে আসা তাদের কাছে ‘দ্বিতীয় জন্মের’ মতো। তিনটি বাসে করে যাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। হঠাৎ তুষারধসের পর প্রবল পানির স্রোত বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে ৩টি বাসের মধ্যে দুটি ভেসে যায়। এনডিটিভির বরাত এ তথ্য জানা যায়।
বেঁচে ফেরা তীর্থযাত্রী বিজয়ভুবনেশ্বরী জানান, পানির স্রোত আঘাত করার সময় বোমা বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ হয়েছিল। সামনে ও পেছনের বাসের মাঝে তাদের বাস আটকে যায়। প্রাণ বাঁচাতে তারা বাসের ছাদে উঠে পড়েন। পরে পাহাড়ের ওপর একটি আর্মড রিজার্ভ পুলিশ ক্যাম্পে আশ্রয় নেন তারা। এ সময় পুলিশ তাদের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করে সাহায্য করে।
তিনি বলেন, ‘আমি ৯০ শতাংশই ভাবছিলাম যে আর বাড়ি ফিরতে পারব না। শুধু আমার মেয়ের কথাই মনে পড়ছিল।’
আরেক তীর্থযাত্রী কিরুবাথিরি বলেন, ‘এটা আমার নতুন জন্ম। এখন আর কোনো অভিযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন যে বাস্তব, এই ঘটনা সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছে। অন্যদের ভুলের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় দরিদ্র মানুষকে।’
তিনি জানান, এই ঘটনা তার জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।
প্রবীণ তীর্থযাত্রী ভাল্লিনায়কি বলেন, প্রকৃতির এই তাণ্ডব ছিল ভয়াবহ। এটা ছিল অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া। মনে হচ্ছিল কংক্রিটের কোনো আগ্নেয়গিরি যেন আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে।
শুক্রবার চেন্নাই বিমানবন্দরে তাদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। স্বজনদের ফিরে পেয়ে অনেক পরিবারেই দেখা যায় স্বস্তি ও আবেগের দৃশ্য। তবে এখনও অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছে।
তামিলনাড়ুর স্কুলশিক্ষামন্ত্রী রাজ মোহন জানিয়েছেন, এই সময়ে রাজ্য থেকে প্রায় ৪০০ জন নেপালে গিয়ে থাকতে পারেন। তাদের মধ্যে ১৪০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা নিরাপদে আছেন। তবে অন্তত ৮০ জন এখনও নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া তীর্থযাত্রীদের প্রথমে নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে নিয়ে আসা হয়। তাদের ভারতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। এ কাজে সমন্বয় করতে তামিলনাড়ু সরকারের চারজন মন্ত্রীকে দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে।
জলসম্পদমন্ত্রী বুসি আনন্দ বলেন, নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এখনো পরিস্থিতি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কোনো চূড়ান্ত সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
প্রবীণ নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ বাবার সন্ধানে ভালো খবরের আশায় চেন্নাই বিমানবন্দরে এসেছিলেন। কিন্তু বাবার কোনো খবর না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান তিনি।
নেপাল বিপর্যয়ে তামিলনাড়ুর তীর্থযাত্রীদের পরিস্থিতি নিয়ে শুক্রবার মাদ্রাজ হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলাও দায়ের হয়েছে। এতে নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ শনিবার বন্যায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা সংশোধন করেছে। নতুন হিসাবে জানানো হয়েছে, দেশটিতে ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ এবং ৬২৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
শুক্রবার রাতে নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯২৪ জন। নতুন হিসাবে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এছাড়া ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি।
বন্যার পর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান এখনো চলছে।

চলনবিলের সময় ডেস্ক 
























