ঢাকা , রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গোপন সংবাদের অভিযানে মাদকসেবী দুই তরুণ আটক, মিলল সাজা চাঁপাই প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত আক্তারুজ্জামান- সম্পাদক জমসেদ আলী চাটমোহরে ‘ভূতের আতঙ্ক’, গ্রামবাসীর উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল ৩৪৪ জনের তালিকায় নাম থাকলেও রাঙ্গাবালীতে একমাত্র বাদ:সোহান বিজয় প্রমাণশূন্য ভেরিফিকেশনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠলো পরিবারের মিজাফ স্টার অ্যাওয়ার্ড পেলেন অভিনেতা শামীম জামান জ্বালানির দাম বাড়তেই চোখ রাঙাচ্ছে বাজার চাপে ভোক্তা এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের কোয়ার্টারে বাংলাদেশসহ ৮ দল, কে কার মুখোমুখি যুদ্ধাপরাধীদের জায়গা আদালতে, জাতিসংঘের মঞ্চে নয়: এরদোয়ান নদী ভাঙনরোধে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়া হবে: জহির উদ্দিন স্বপন ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা, পুলিশকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জ্বালানির দাম বাড়তেই চোখ রাঙাচ্ছে বাজার চাপে ভোক্তা




দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্নবিত্ত ও খেটেখাওয়া মানুষের। তবে পরিসংখ্যানের হিসাবে তিন মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি কমছে। এমন সময় এক ধাক্কায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিত্যপণ্যের বাজারে এরই মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আটা, খোলা তেল, সবজি, চাল, ডিমসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী। এতে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে সল্প আয়ের মানুষের কপালে। সীমিত আয়ের টাকায় মাসের বাজারের হিসাব মেলানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে মধ্যবিত্তদেরও।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের জুলাইয়ের চেয়ে কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। জুলাইয়ে যা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমেছে। এর আগে জুন মাসে সার্বিক ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ১৬ ও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর গত মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ ও ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির এ পরিসংখ্যান যেখানে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করছিল, ঠিক তখন গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বাজারে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।

এক ধাক্কায় এতটা মূল্যবৃদ্ধি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন—সবখানেই প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির দাবি করেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না। যাতে মূল্যস্ফীতি না বাড়ে এবং পণ্যের সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য সরকার সরবরাহব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কিন্তু রাজধানীর বাজার বলছে, এরই মধ্যে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে বাজারে দ্রব্যমূল্য অতিরিক্ত বাড়ার প্রবণতা নতুন নয়। আগেও হয়েছে, এবারও পাঁয়তারা চলছে। তাই এ কারণে মূল্যস্ফীতি যাতে বেশি না বাড়ে, সেদিকে কড়া নজরদারির তাগিদ দিয়েছেন তারা।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, দিনের পর দিন খরচের চাপ বাড়ায় মানুষ এখন অতিষ্ঠ, তাদের ক্ষোভ বাড়ছে। এমন সময় জ্বালানির দাম বাড়ায় যে চাপ তৈরি হবে, সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে কোনো কৌশল পরিষ্কার নয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিন্তু ‘ছোঁয়াচে’ বিষয়। এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে, অনেকে এই অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াবে। তাই এটি যাতে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে সরকারের কড়া নজর রাখতে হবে।

সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে উত্তাপ বাড়ছে: ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বাড়তি এ খরচ কাঁচাপণ্যসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে যোগ হচ্ছে। বাজার চিত্র বলছে, সবজিসহ তরল দুধ, খোলা আটা-ময়দা, খোলা পাম তেল, চাল, ডাল, ডিমের দাম বাড়ছে।

সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে বেগুনের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আগে ৮০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া সবজিগুলো এখন ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচমরিচের কেজিও ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে। গত সপ্তাহে যা ১০০ থেকে ১৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।

চালের বাজারে বিশেষ করে মাঝারি মানের চালের কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। খোলা আটা-ময়দা কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে। বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেল। কমেছে বোতলজাত তেলের সরবরাহ, কোথাও কোথাও রাখা হচ্ছে বাড়তি দাম। ১৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া ডিমের ডজন (ফার্মের বাদামি ডিম) ১৫০ টাকা হয়েছে। দাম বেড়ে হালি সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে তরল দুধের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এক লিটার দুধের দাম পড়ছে এখন ১১০ টাকা।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনেও দাম বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবেও সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে খোলা পাম ও পাম সুপার তেল, এক ও দুই লিটারে সয়াবিনের বোতল, খোলা আটা-ময়দা, মাঝারি মানের চাল, বড় দানার মশুর ডাল, বেগুন, কাঁচামরিচ ও ডিমের দাম বেড়েছে।

বেকায়দায় সাধারণ ক্রেতা: আগে থেকে চড়া বাজারে নতুন করে দাম বাড়ায় বেকায়দায় পড়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মোস্তাক আহমেদ। বাসাবো এলাকার এই বাসিন্দা বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় প্রতিদিনের চাল, ডাল, তেল, মসলা কিনতেই মাসের বাজেটে টান পড়ছে। মাছ-মাংস আগে থেকেই কেনা কমিয়েছি। ছিল ডিম, সেটিও এখন দামি খাবার। তরল দুধের দামও বেড়েছে। সবজির বাজারে যেতেও এখন ভয় হয়। মাসের বাজার খরচ মেলানোই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে উঠেছে।

কদমতলী এলাকার বাসিন্দা দিনমজুর মোতাহার মিয়া বলেন, ‘দাম বাড়ায় একটার পর একটা জিনিস খাওন বাদ দিছি। এহন দরকারি জিনিস কিনতেই তো পকেট ফাঁকা হইয়া যাইতাছে। দাম আরও বাড়তাছে। কেমনে কি করুম কুল পাই না।’

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আগে থেকেই নানা অজুহাতে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় তারা আরেক নতুন অজুহাত পেল। অন্যদিকে বাজারে নজরদারির ব্যাপক ঘাটতি। যেটুকু অভিযান-জরিমানা হয়, তা কাজে আসছে না। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করতে হবে। সরবরাহ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পরামর্শ: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল অর্থনীতি এবং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের মধ্যে জ্বালানির দাম একবারে এতটা বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। সরকার জ্বালানি আমদানির কর সাময়িকভাবে কমিয়ে, অপচয় ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখতে পারত। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, খাদ্য ও উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে। সরকারকে পরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।

ড. জাহিদ হোসেনও বলেন, আর্থিক সংগতি না থাকায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানোর সুযোগ নেই হয়তো, কিন্তু যে বরাদ্দ ও কর্মসূচিগুলো রয়েছে, সেগুলো যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

গোপন সংবাদের অভিযানে মাদকসেবী দুই তরুণ আটক, মিলল সাজা

জ্বালানির দাম বাড়তেই চোখ রাঙাচ্ছে বাজার চাপে ভোক্তা

আপডেট সময় : ৭ ঘন্টা আগে

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্নবিত্ত ও খেটেখাওয়া মানুষের। তবে পরিসংখ্যানের হিসাবে তিন মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি কমছে। এমন সময় এক ধাক্কায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিত্যপণ্যের বাজারে এরই মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আটা, খোলা তেল, সবজি, চাল, ডিমসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী। এতে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে সল্প আয়ের মানুষের কপালে। সীমিত আয়ের টাকায় মাসের বাজারের হিসাব মেলানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে মধ্যবিত্তদেরও।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের জুলাইয়ের চেয়ে কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। জুলাইয়ে যা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমেছে। এর আগে জুন মাসে সার্বিক ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ১৬ ও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর গত মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ ও ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির এ পরিসংখ্যান যেখানে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করছিল, ঠিক তখন গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বাজারে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।

এক ধাক্কায় এতটা মূল্যবৃদ্ধি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন—সবখানেই প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির দাবি করেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না। যাতে মূল্যস্ফীতি না বাড়ে এবং পণ্যের সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য সরকার সরবরাহব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কিন্তু রাজধানীর বাজার বলছে, এরই মধ্যে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে বাজারে দ্রব্যমূল্য অতিরিক্ত বাড়ার প্রবণতা নতুন নয়। আগেও হয়েছে, এবারও পাঁয়তারা চলছে। তাই এ কারণে মূল্যস্ফীতি যাতে বেশি না বাড়ে, সেদিকে কড়া নজরদারির তাগিদ দিয়েছেন তারা।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, দিনের পর দিন খরচের চাপ বাড়ায় মানুষ এখন অতিষ্ঠ, তাদের ক্ষোভ বাড়ছে। এমন সময় জ্বালানির দাম বাড়ায় যে চাপ তৈরি হবে, সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে কোনো কৌশল পরিষ্কার নয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিন্তু ‘ছোঁয়াচে’ বিষয়। এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে, অনেকে এই অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াবে। তাই এটি যাতে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে সরকারের কড়া নজর রাখতে হবে।

সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে উত্তাপ বাড়ছে: ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বাড়তি এ খরচ কাঁচাপণ্যসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে যোগ হচ্ছে। বাজার চিত্র বলছে, সবজিসহ তরল দুধ, খোলা আটা-ময়দা, খোলা পাম তেল, চাল, ডাল, ডিমের দাম বাড়ছে।

সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে বেগুনের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আগে ৮০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া সবজিগুলো এখন ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচমরিচের কেজিও ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে। গত সপ্তাহে যা ১০০ থেকে ১৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।

চালের বাজারে বিশেষ করে মাঝারি মানের চালের কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। খোলা আটা-ময়দা কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে। বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেল। কমেছে বোতলজাত তেলের সরবরাহ, কোথাও কোথাও রাখা হচ্ছে বাড়তি দাম। ১৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া ডিমের ডজন (ফার্মের বাদামি ডিম) ১৫০ টাকা হয়েছে। দাম বেড়ে হালি সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে তরল দুধের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এক লিটার দুধের দাম পড়ছে এখন ১১০ টাকা।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনেও দাম বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবেও সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে খোলা পাম ও পাম সুপার তেল, এক ও দুই লিটারে সয়াবিনের বোতল, খোলা আটা-ময়দা, মাঝারি মানের চাল, বড় দানার মশুর ডাল, বেগুন, কাঁচামরিচ ও ডিমের দাম বেড়েছে।

বেকায়দায় সাধারণ ক্রেতা: আগে থেকে চড়া বাজারে নতুন করে দাম বাড়ায় বেকায়দায় পড়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মোস্তাক আহমেদ। বাসাবো এলাকার এই বাসিন্দা বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় প্রতিদিনের চাল, ডাল, তেল, মসলা কিনতেই মাসের বাজেটে টান পড়ছে। মাছ-মাংস আগে থেকেই কেনা কমিয়েছি। ছিল ডিম, সেটিও এখন দামি খাবার। তরল দুধের দামও বেড়েছে। সবজির বাজারে যেতেও এখন ভয় হয়। মাসের বাজার খরচ মেলানোই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে উঠেছে।

কদমতলী এলাকার বাসিন্দা দিনমজুর মোতাহার মিয়া বলেন, ‘দাম বাড়ায় একটার পর একটা জিনিস খাওন বাদ দিছি। এহন দরকারি জিনিস কিনতেই তো পকেট ফাঁকা হইয়া যাইতাছে। দাম আরও বাড়তাছে। কেমনে কি করুম কুল পাই না।’

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আগে থেকেই নানা অজুহাতে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় তারা আরেক নতুন অজুহাত পেল। অন্যদিকে বাজারে নজরদারির ব্যাপক ঘাটতি। যেটুকু অভিযান-জরিমানা হয়, তা কাজে আসছে না। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করতে হবে। সরবরাহ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পরামর্শ: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল অর্থনীতি এবং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের মধ্যে জ্বালানির দাম একবারে এতটা বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। সরকার জ্বালানি আমদানির কর সাময়িকভাবে কমিয়ে, অপচয় ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখতে পারত। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, খাদ্য ও উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে। সরকারকে পরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।

ড. জাহিদ হোসেনও বলেন, আর্থিক সংগতি না থাকায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানোর সুযোগ নেই হয়তো, কিন্তু যে বরাদ্দ ও কর্মসূচিগুলো রয়েছে, সেগুলো যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।