ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নীতি আগামী পাঁচ বছরের জন্য স্থগিতসহ ১৮ দফা দাবি

চা চাষ বৃদ্ধির নীতিমালা মানছেন না মালিকরা




চা নীতি অনুসারে বাগানের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে প্রতি বছর আড়াই শতাংশ হারে চা চাষ বাড়াতে হবে। বাধ্যতামূলক রোপণ (ম্যান্ডাটরি প্লান্টিং) নীতির আওতায় চাষ বৃদ্ধির মাধ্যমে চায়ের উৎপাদন বাড়ানোর কথা; কিন্তু অনেক বাগান মালিকই এই নীতিমালা মানছেন না। রোপণ করছেন না নতুন চারা। বাড়াচ্ছেন না চা চাষ। উপরন্তু এই নীতি আগামী পাঁচ বছরের জন্য স্থগিতসহ ১৮ দফা দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার বলছে রপ্তানির বাজারে দেশের চায়ের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করতে বাড়তি উৎপাদন প্রয়োজন। বাগান না বাড়লে উৎপাদন বাড়বে না। এসব বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে সরকার বাণিজ্য সচিবকে সদস্য সচিব করে একটি পরামর্শক কমিটিও গঠন করেছে।

জানা গেছে, চা শিল্প খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শিল্পমালিকরা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তাতে তারা নতুন চা চাষ স্থগিত রাখার দাবি ছাড়াও ১৮ দফা সমস্যা তুলে ধরেছেন। সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—চায়ের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ না হওয়া, চাকে কৃষিপণ্য ঘোষণা না করা, বাগান থেকে সরাসরি বিক্রি ও রপ্তানির জটিলতা, পর্যাপ্ত অর্থায়নে সমস্যা, ঋণের অতিরিক্ত সুদ হার, চা বিক্রির ওপর ১ শতাংশ উপকরের বোঝা, জমিতে সৌর বিদ্যুতের অনুমোদন না থাকা, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে আর্থিক সংকট ও চা-কেন্দ্রিক পর্যটনের উদ্যোগ না থাকা ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধান করে চা শিল্পকে উন্নয়নের জন্য ১৮টি সুপারিশ দিয়েছে ওই প্রতিবেদনে। বাংলাদেশীয় চা সংসদ (বিটিএ) দেওয়া ওই প্রতিবেদনে ২ হাজার কোটি টাকার একটি আবর্তক তহবিল গঠনের কথাও বলা হয়; যা থেকে ২-৬ শতাংশ হারে ঋণ নিতে পারবেন শিল্পমালিকরা।

জানা যায়, প্রতিবেদনে উল্লেখিত সমস্যা ও মালিকদের দাবিগুলোর বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের ‘মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। বাণিজ্য সচিবকে সদস্য সচিব করে গঠন করা ওই কমিটিকে তিনটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ৩০ দিনের মধ্যে মতামত ও সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন—প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা সংসদের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা সংসদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক এবং টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান।

শিল্পমালিকদের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে চা উৎপাদনের ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও নিলামে চায়ের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। ২০১৬ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে খরচ ছিল ১৫১ দশমিক ৫১ টাকা এবং গড় নিলাম মূল্য ছিল ২০০ টাকা (অর্থাৎ কেজি প্রতি লাভ ছিল ৪৮ দশমিক ৫২ টাকা)। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে প্রতি কেজি চায়ের উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭০ টাকা, যেখানে গড় নিলাম মূল্য মাত্র ২৪৬ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে প্রতি কেজি চায়ে বাগানগুলোকে ২৩ দশমিক ১০ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর মাঝে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে কেজিপ্রতি ৫৪ দশমিক ০৯ টাকা এবং ৫৫ দশমিক ৫৪ টাকা লোকসান হয়েছে, যা বাগানগুলোর নগদ প্রবাহ ও আর্থিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।

শিল্পমালিকরা বলছেন, ১৯৭০ সালে দেশে চায়ের মোট উৎপাদন ছিল ৩১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন কেজি, যা ২০২৫ সালে ৯৪ দশমিক ৯১ মিলিয়ন কেজিতে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এই উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও নিলামে চায়ের ক্রমাগত দর পতনের কারণে বাগানগুলোর নগদ প্রবাহ এবং আর্থিক সক্ষমতায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

এ ছাড়া তারা কৃষি ঋণের বাড়তি সুদ কমানোর দাবি জানান। শিল্পমালিকরা বলেন, প্রতি বছর বাগান পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে যে শস্য বন্ধকি ঋণ দেওয়া হয়, তা সময়মতো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে মঞ্জুর ও বিতরণ করা হচ্ছে না। এতে সারের ব্যবহার, কীটনাশক ক্রয় এবং শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি ও রেশন পরিশোধের মতো জরুরি কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া, কৃষি ব্যাংক এই ঋণে ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ উচ্চ সুদ আরোপ করছে, যা অন্যান্য কৃষি ফসলের সুদের চেয়ে অনেক বেশি।

উৎপাদিত চায়ের বিক্রয়মূল্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ ‘টি সেস’ (উপকর) বাগানগুলোর জন্য একটি বাড়তি ব্যয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তারা। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এটি বহুবছর আগেই তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চা বাগান ভূমি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা-২০১৭’ এর ধারা-৮ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের অনুমতি বা অনাপত্তিপত্র ছাড়া চা বাগানের জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া যায় না। এই অনাপত্তিপত্র পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ব্যাংকগুলো সময়মতো ঋণ দিচ্ছে না, যার ফলে বাগানগুলো চরম তারল্য সংকটে পড়ছে। চা উৎপাদনের পিক মৌসুমে (সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা) ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কাঁচা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হয়ে চায়ের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।

চা শ্রমিকদের গৃহায়ন, স্যানিটেশন, সুপেয় পানি ও সামগ্রিক কল্যাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ২ শতাংশ স্বল্প সুদে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি ‘আবর্তনশীল তহবিল’ গঠন করতে হবে। বাগান মালিকদের প্রস্তাবিত মূল্য প্রতি কেজি ২৭৫ টাকা করণ ও চাষের অনুপযোগী পতিত জমিতে ১০-১৫ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি চেয়েছেন মালিকরা।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের (বিটিএ) চেয়ারম্যান কামরান তানভিরুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘কৃষিভিত্তিক রপ্তানিমুখী খাত ‘চা শিল্প’ বর্তমানে এক গভীর অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই আগে শিল্পটিকে বাঁচাতে হবে। আগেই রপ্তানির চিন্তার দরকার নেই। ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ ঋণ নিয়ে শিল্প টিকিয়ে রাখা যায় না। আমাদের শিল্পটি কৃষি হলেও এটি কৃষির স্বীকৃতি নেই। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে চা চাষ করে লাভবান হওয়া যায় না। বিশ্ববাজারে চায়ের অনেক উদ্বৃত্ত রয়েছে। বাড়তি উৎপাদন করে রপ্তানির বাজার ধরা সহজ নয়। তা ছাড়া আমাদের চা আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতের মতো গুণগত মানের করা সম্ভব নয়। দেশের চাহিদার বেশি উৎপাদন হলে এই চা নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে মালিকদের। ফলে আড়াই শতাংশ করে বাড়ানোর যে নীতি রয়েছে তা স্থগিত করতে বলেছি আমরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ‘মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটি’র প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে মালিক পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মোট দাগে চারটি বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা হবে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো চা বাগানের বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ, চা বাগান মালিকদের খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলিকরণ এবং নতুন করে ঋণ প্রদান; চা বাগানের জন্য ৬ শতাংশ সুদে একটি আবর্তক তহবিল গঠন; চা-কে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা এবং চা খাতে বর্তমানে ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণের পরিবর্তে ৪ শতাংশ হারে ঋণ প্রদান ব্যবস্থা করা। চা বাগানের অব্যবহৃত জায়গায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপন বিষয়ে মতামতসহ প্রতিবেদন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে উপস্থাপন করার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হবে।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও চা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মালিক পক্ষ যতটা সংকটময় বলছেন, শিল্পের অবস্থা ততটা খারাপ নয়। তবে মালিক পক্ষের কিছু দাবির যৌক্তিকতা রয়েছে বলেও মনে করছেন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অন্যান্য দেশের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেশি। এটা কমানোর চেষ্টা চলছে বলেও জানায় তারা। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে দেশের চায়ের চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদনের ৯৫ শতাংশই স্থানীয় চাহিদা পূরণ করতে লাগে। রপ্তানির জন্য থাকে মাত্র ৫ শতাংশ। চা নীতি ১৯৮৯-৯১ অনুসারে প্রতিবছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাগানে চারা রোপণ বাড়ালে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব বলেও মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশে ১৬৯টি চা বাগান আছে, যা ২ লাখ ৮০ হাজার একরের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে ৯০টি বাগান মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। সেখান থেকে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে। সিলেট অঞ্চলের আরেক জেলা হবিগঞ্জ প্রায় ২২ শতাংশ উৎপাদনে অবদান রাখে।

চা উৎপাদন তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ সালে দেশে মোট ৮ কোটি ৫০ লাখ কেজির কিছু বেশি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে মোট চায়ের উৎপাদন হয়েছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি প্রায়। অন্যদিকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চা রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় কমে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজিতে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালে সাড়ে ২৪ লাখ কেজি চা রপ্তানি হয়েছিল, যা কি না ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে এই পরিমাণ ছিল ২৫ লাখ ৬০ হাজার কেজি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে চা রপ্তানি হয় কৃষিজাত পণ্য হিসেবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশে থেকে সর্বসাকল্যে চা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। চলতি বছরের প্রথম মাসে দেশে থেকে চা রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার সমমূল্যের। তার আগের মাস জুনেও একই পরিমাণ রপ্তানি ছিল।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মালিক পক্ষ যতটা সংকটময় বলছেন ততটা নয়। এখন চা শিল্পের অবস্থা মোটামুটি ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ বছর আমাদের লাখ ১০৪ মিলিয়ন চা উৎপাদনের। আশা করছি, তা পার হয়ে যাবে। এ ছাড়া চায়ের দামও ভালো রয়েছে, ২৭৫ টাকার বেশি রয়েছে চায়ের দাম।’ তিনি বলেন, ‘রপ্তানির জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। রপ্তানির বাজারে আমাদের চায়ের বড় চ্যালেঞ্জ হলো শ্রীলঙ্কা, কেনিয়াসহ অন্যান্য দেশের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেশি। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে উৎপাদন খরচ কমানো যায়। এক্ষেত্রে মালিকদের দাবি অনুসারে কৃষি পণ্য ঘোষণা করলে স্বল্প সুদে বিনিয়োগ পাবেন উৎপাদকরা। এতে উৎপাদন খরচও কমতে পারে।’

ট্যাগস :
পাবলিস্ট বাই নিউজ

জনপ্রিয় সংবাদ

পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর তৈরি চরম স্বাদ—- বগুড়া ডলার চানাচুর এন্ড সেমাই কারখানার ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায়

নীতি আগামী পাঁচ বছরের জন্য স্থগিতসহ ১৮ দফা দাবি

চা চাষ বৃদ্ধির নীতিমালা মানছেন না মালিকরা

আপডেট সময় : ০৮:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চা নীতি অনুসারে বাগানের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে প্রতি বছর আড়াই শতাংশ হারে চা চাষ বাড়াতে হবে। বাধ্যতামূলক রোপণ (ম্যান্ডাটরি প্লান্টিং) নীতির আওতায় চাষ বৃদ্ধির মাধ্যমে চায়ের উৎপাদন বাড়ানোর কথা; কিন্তু অনেক বাগান মালিকই এই নীতিমালা মানছেন না। রোপণ করছেন না নতুন চারা। বাড়াচ্ছেন না চা চাষ। উপরন্তু এই নীতি আগামী পাঁচ বছরের জন্য স্থগিতসহ ১৮ দফা দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার বলছে রপ্তানির বাজারে দেশের চায়ের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করতে বাড়তি উৎপাদন প্রয়োজন। বাগান না বাড়লে উৎপাদন বাড়বে না। এসব বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে সরকার বাণিজ্য সচিবকে সদস্য সচিব করে একটি পরামর্শক কমিটিও গঠন করেছে।

জানা গেছে, চা শিল্প খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শিল্পমালিকরা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তাতে তারা নতুন চা চাষ স্থগিত রাখার দাবি ছাড়াও ১৮ দফা সমস্যা তুলে ধরেছেন। সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—চায়ের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ না হওয়া, চাকে কৃষিপণ্য ঘোষণা না করা, বাগান থেকে সরাসরি বিক্রি ও রপ্তানির জটিলতা, পর্যাপ্ত অর্থায়নে সমস্যা, ঋণের অতিরিক্ত সুদ হার, চা বিক্রির ওপর ১ শতাংশ উপকরের বোঝা, জমিতে সৌর বিদ্যুতের অনুমোদন না থাকা, শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে আর্থিক সংকট ও চা-কেন্দ্রিক পর্যটনের উদ্যোগ না থাকা ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধান করে চা শিল্পকে উন্নয়নের জন্য ১৮টি সুপারিশ দিয়েছে ওই প্রতিবেদনে। বাংলাদেশীয় চা সংসদ (বিটিএ) দেওয়া ওই প্রতিবেদনে ২ হাজার কোটি টাকার একটি আবর্তক তহবিল গঠনের কথাও বলা হয়; যা থেকে ২-৬ শতাংশ হারে ঋণ নিতে পারবেন শিল্পমালিকরা।

জানা যায়, প্রতিবেদনে উল্লেখিত সমস্যা ও মালিকদের দাবিগুলোর বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের ‘মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। বাণিজ্য সচিবকে সদস্য সচিব করে গঠন করা ওই কমিটিকে তিনটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ৩০ দিনের মধ্যে মতামত ও সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন—প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা সংসদের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা সংসদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক এবং টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান।

শিল্পমালিকদের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছর ধরে চা উৎপাদনের ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও নিলামে চায়ের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। ২০১৬ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে খরচ ছিল ১৫১ দশমিক ৫১ টাকা এবং গড় নিলাম মূল্য ছিল ২০০ টাকা (অর্থাৎ কেজি প্রতি লাভ ছিল ৪৮ দশমিক ৫২ টাকা)। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে প্রতি কেজি চায়ের উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭০ টাকা, যেখানে গড় নিলাম মূল্য মাত্র ২৪৬ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে প্রতি কেজি চায়ে বাগানগুলোকে ২৩ দশমিক ১০ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর মাঝে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে কেজিপ্রতি ৫৪ দশমিক ০৯ টাকা এবং ৫৫ দশমিক ৫৪ টাকা লোকসান হয়েছে, যা বাগানগুলোর নগদ প্রবাহ ও আর্থিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।

শিল্পমালিকরা বলছেন, ১৯৭০ সালে দেশে চায়ের মোট উৎপাদন ছিল ৩১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন কেজি, যা ২০২৫ সালে ৯৪ দশমিক ৯১ মিলিয়ন কেজিতে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এই উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও নিলামে চায়ের ক্রমাগত দর পতনের কারণে বাগানগুলোর নগদ প্রবাহ এবং আর্থিক সক্ষমতায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

এ ছাড়া তারা কৃষি ঋণের বাড়তি সুদ কমানোর দাবি জানান। শিল্পমালিকরা বলেন, প্রতি বছর বাগান পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে যে শস্য বন্ধকি ঋণ দেওয়া হয়, তা সময়মতো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে মঞ্জুর ও বিতরণ করা হচ্ছে না। এতে সারের ব্যবহার, কীটনাশক ক্রয় এবং শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি ও রেশন পরিশোধের মতো জরুরি কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া, কৃষি ব্যাংক এই ঋণে ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ উচ্চ সুদ আরোপ করছে, যা অন্যান্য কৃষি ফসলের সুদের চেয়ে অনেক বেশি।

উৎপাদিত চায়ের বিক্রয়মূল্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ ‘টি সেস’ (উপকর) বাগানগুলোর জন্য একটি বাড়তি ব্যয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তারা। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এটি বহুবছর আগেই তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চা বাগান ভূমি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা-২০১৭’ এর ধারা-৮ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের অনুমতি বা অনাপত্তিপত্র ছাড়া চা বাগানের জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া যায় না। এই অনাপত্তিপত্র পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ব্যাংকগুলো সময়মতো ঋণ দিচ্ছে না, যার ফলে বাগানগুলো চরম তারল্য সংকটে পড়ছে। চা উৎপাদনের পিক মৌসুমে (সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা) ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কাঁচা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হয়ে চায়ের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।

চা শ্রমিকদের গৃহায়ন, স্যানিটেশন, সুপেয় পানি ও সামগ্রিক কল্যাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ২ শতাংশ স্বল্প সুদে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি ‘আবর্তনশীল তহবিল’ গঠন করতে হবে। বাগান মালিকদের প্রস্তাবিত মূল্য প্রতি কেজি ২৭৫ টাকা করণ ও চাষের অনুপযোগী পতিত জমিতে ১০-১৫ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি চেয়েছেন মালিকরা।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের (বিটিএ) চেয়ারম্যান কামরান তানভিরুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘কৃষিভিত্তিক রপ্তানিমুখী খাত ‘চা শিল্প’ বর্তমানে এক গভীর অর্থনৈতিক ও নীতিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই আগে শিল্পটিকে বাঁচাতে হবে। আগেই রপ্তানির চিন্তার দরকার নেই। ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ ঋণ নিয়ে শিল্প টিকিয়ে রাখা যায় না। আমাদের শিল্পটি কৃষি হলেও এটি কৃষির স্বীকৃতি নেই। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে চা চাষ করে লাভবান হওয়া যায় না। বিশ্ববাজারে চায়ের অনেক উদ্বৃত্ত রয়েছে। বাড়তি উৎপাদন করে রপ্তানির বাজার ধরা সহজ নয়। তা ছাড়া আমাদের চা আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতের মতো গুণগত মানের করা সম্ভব নয়। দেশের চাহিদার বেশি উৎপাদন হলে এই চা নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে মালিকদের। ফলে আড়াই শতাংশ করে বাড়ানোর যে নীতি রয়েছে তা স্থগিত করতে বলেছি আমরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ‘মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটি’র প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে মালিক পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মোট দাগে চারটি বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা হবে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো চা বাগানের বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ, চা বাগান মালিকদের খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলিকরণ এবং নতুন করে ঋণ প্রদান; চা বাগানের জন্য ৬ শতাংশ সুদে একটি আবর্তক তহবিল গঠন; চা-কে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা এবং চা খাতে বর্তমানে ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণের পরিবর্তে ৪ শতাংশ হারে ঋণ প্রদান ব্যবস্থা করা। চা বাগানের অব্যবহৃত জায়গায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপন বিষয়ে মতামতসহ প্রতিবেদন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে উপস্থাপন করার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হবে।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও চা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মালিক পক্ষ যতটা সংকটময় বলছেন, শিল্পের অবস্থা ততটা খারাপ নয়। তবে মালিক পক্ষের কিছু দাবির যৌক্তিকতা রয়েছে বলেও মনে করছেন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অন্যান্য দেশের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেশি। এটা কমানোর চেষ্টা চলছে বলেও জানায় তারা। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে দেশের চায়ের চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদনের ৯৫ শতাংশই স্থানীয় চাহিদা পূরণ করতে লাগে। রপ্তানির জন্য থাকে মাত্র ৫ শতাংশ। চা নীতি ১৯৮৯-৯১ অনুসারে প্রতিবছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাগানে চারা রোপণ বাড়ালে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব বলেও মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশে ১৬৯টি চা বাগান আছে, যা ২ লাখ ৮০ হাজার একরের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে ৯০টি বাগান মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। সেখান থেকে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে। সিলেট অঞ্চলের আরেক জেলা হবিগঞ্জ প্রায় ২২ শতাংশ উৎপাদনে অবদান রাখে।

চা উৎপাদন তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ সালে দেশে মোট ৮ কোটি ৫০ লাখ কেজির কিছু বেশি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে মোট চায়ের উৎপাদন হয়েছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি প্রায়। অন্যদিকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চা রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় কমে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজিতে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালে সাড়ে ২৪ লাখ কেজি চা রপ্তানি হয়েছিল, যা কি না ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে এই পরিমাণ ছিল ২৫ লাখ ৬০ হাজার কেজি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে চা রপ্তানি হয় কৃষিজাত পণ্য হিসেবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশে থেকে সর্বসাকল্যে চা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। চলতি বছরের প্রথম মাসে দেশে থেকে চা রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার সমমূল্যের। তার আগের মাস জুনেও একই পরিমাণ রপ্তানি ছিল।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মালিক পক্ষ যতটা সংকটময় বলছেন ততটা নয়। এখন চা শিল্পের অবস্থা মোটামুটি ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ বছর আমাদের লাখ ১০৪ মিলিয়ন চা উৎপাদনের। আশা করছি, তা পার হয়ে যাবে। এ ছাড়া চায়ের দামও ভালো রয়েছে, ২৭৫ টাকার বেশি রয়েছে চায়ের দাম।’ তিনি বলেন, ‘রপ্তানির জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। রপ্তানির বাজারে আমাদের চায়ের বড় চ্যালেঞ্জ হলো শ্রীলঙ্কা, কেনিয়াসহ অন্যান্য দেশের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেশি। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে উৎপাদন খরচ কমানো যায়। এক্ষেত্রে মালিকদের দাবি অনুসারে কৃষি পণ্য ঘোষণা করলে স্বল্প সুদে বিনিয়োগ পাবেন উৎপাদকরা। এতে উৎপাদন খরচও কমতে পারে।’