ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ছয় মাস পার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পরিবর্তনটি হলো উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে থাকতে চাইছে না। তবে এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়াতে চাইছে তারা।
গত ছয় মাসের যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তার ধরনই বদলে দিয়েছে। আগে যে হুমকিগুলো সামরিক মহড়া বা পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন সেগুলো বাস্তব সংকটে পরিণত হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর শহর, বিমানবন্দর, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সমুদ্রপথ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তার জন্য শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না, এমন ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রধান ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন সামরিক সহায়তা দিয়েছে, বিভিন্ন দেশে সামরিক ঘাঁটি রেখেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
এই ব্যবস্থা এখনো শেষ হয়ে যায়নি; বরং যুক্তরাষ্ট্র আগামী দিনেও উপসাগরীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার থাকবে। কিন্তু নতুন বাস্তবতা হলো, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন মনে করছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না।
তাই তারা নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাইরের আরও কিছু শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট মক্কায় তিন দেশ এই চুক্তিতে সই করে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ কারণে চুক্তিটিকে অনেকে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ন্যাটোর মতো একটি বিশাল ও একক সামরিক জোট তৈরি হওয়া জরুরি নয়; বরং এই অঞ্চলের বাস্তবতার জন্য একাধিক দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা বেশি কার্যকর হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের নিরাপত্তা হুমকি এক নয়। কোনো দেশের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বড় হুমকি, আবার কোনো দেশের জন্য ড্রোন, সশস্ত্র গোষ্ঠী বা সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি বড় জোটের বদলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে একাধিক অংশীদারত্ব তৈরি হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী দেশগুলো একে অন্যকে সহযোগিতা করবে।
নতুন এই ব্যবস্থায় নেতৃত্বের ধারণাটিও বদলাতে পারে। সব পরিস্থিতিতে একটি দেশ নেতৃত্ব দেবে—এমন ব্যবস্থা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়।
যে দেশ সরাসরি কোনো হুমকির মুখে পড়বে, সেই দেশ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যে দেশের সবচেয়ে বেশি সক্ষমতা রয়েছে, তাকে বেশি দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সমুদ্রপথে সংকট হলে শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা দেশ বড় ভূমিকা নিতে পারে। আবার বিমান হামলার ক্ষেত্রে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা দেশকে সামনে রাখা যেতে পারে।
এ ধরনের নমনীয় সহযোগিতাই হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতার সঙ্গে বেশি মানানসই।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এসব চুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে।
একটি দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দেশগুলো কি দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য দিতে পারবে? বিমান প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা করতে পারবে? সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে পারবে? সামরিক বাহিনীগুলো কি পরস্পরের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ ও সমন্বয় করতে পারবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক না হলে কাগজে থাকা প্রতিরক্ষা চুক্তির খুব বেশি মূল্য থাকবে না।
তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যৌথ সামরিক মহড়া, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ পরিকল্পনা। সংকট তৈরি হওয়ার আগেই কে কী দায়িত্ব পালন করবে, সেটিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
এই পরিবর্তনে তুরস্কের গুরুত্বও বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে।
কাতার ও যুক্তরাজ্যের সামরিক সহযোগিতা এর একটি উদাহরণ। দুই দেশের সামরিক বাহিনী যৌথভাবে টাইফুন যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ও পরিচালনা করেছে। কাতার ও তুরস্কও নিজেদের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
এসব সম্পর্ক যুদ্ধের আগেই তৈরি হয়েছিল। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় এগুলোর কার্যকারিতাও পরীক্ষা হয়েছে। মার্চে কাতারের সঙ্গে যৌথ স্কোয়াড্রনে থাকা ব্রিটিশ একটি টাইফুন যুদ্ধবিমান কাতারের দিকে আসা একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করে।
এ ঘটনা দেখিয়েছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা সব সময় বড় কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি দিয়ে শুরু করতে হয় না। দুই দেশের সামরিক বাহিনী নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও যৌথভাবে কাজ করার মাধ্যমেও শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের ছয় মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি নতুন চিত্র তৈরি হতে শুরু করেছে।
এই নতুন ব্যবস্থা সম্ভবত কোনো একক জোটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে না। যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে থাকবে। তার পাশাপাশি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াবে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তি এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে।
অর্থাৎ সামনে আসতে পারে একাধিক অংশীদারত্বের একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একেক ধরনের হুমকি মোকাবিলায় একেক ধরনের দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।
তবে এই ব্যবস্থার আসল পরীক্ষা হবে পরবর্তী সংকটে। আবার কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে এলে, কোনো ড্রোন সীমান্ত অতিক্রম করলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে হুমকি তৈরি হলে দেশগুলো কত দ্রুত একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে ও কাজ করতে পারে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
যদি তারা সত্যিই একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তাহলে ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে নতুন কোনো সামরিক জোট নয়। বরং উপসাগরীয় দেশগুলো এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করেছে, যা আগের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, নমনীয় ও নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে বেশি মানানসই।
লেখক: রশিদ আল-মোহানাদি, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি রিসার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

Reporter Name 























