বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তনের খবরে দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার নিজস্ব রিটেইল পোর্টফোলিও ব্যাংকটির সক্ষমতাকে আরো জোরালো করছে। তাই সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের নামের পাশাপাশি পূবালী ব্যাংকের নামও আলোচনায় এসেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিদ্যমান রিটেইল ব্যবসা, দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, আর্থিক সক্ষমতা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর কারণে ব্যাংকটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে তার রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি বা হস্তান্তরের উদ্যোগ নিলে পূবালী ব্যাংকও বিষয়টি মূল্যায়ন করতে পারে।
তবে সম্ভাব্য কোনো লেনদেনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পোর্টফোলিওর প্রকৃত মূল্য, ঋণের মান, দায়-দায়িত্ব, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনসহ একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।
রিটেইল ব্যবসা গুটিয়ে করপোরেট ব্যাংকিংয়ে জোর
সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে সরে এসে করপোরেট ও ইন্সটিটিউশনাল ব্যাংকিংয়ে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এ নিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের যোগাযোগের তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ও সিএমএসএমই ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে রিটেইল আমানত ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
এ ব্যবসা অধিগ্রহণে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হওয়ার খবর ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্ভাব্য প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে অবগত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিক্রয় বা হস্তান্তরের চূড়ান্ত কাঠামো, পরিধি কিংবা সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি।
প্রক্রিয়াটি এগিয়ে গেলে পোর্টফোলিও মূল্যায়ন, অডিট ও ডিউ ডিলিজেন্সের পর সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব নেওয়ার পর্যায়ে যেতে পারে।
পূবালী ব্যাংক কেন সম্ভাব্য আগ্রহী
পূবালী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের দিকে তাকালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসার সঙ্গে কিছুটা কৌশলগত মিল দেখা যায়। দেশের অন্যতম বড় বেসরকারি ব্যাংক পূবালী ব্যাংক দীর্ঘদিনের শাখাভিত্তিক কার্যক্রমের পাশাপাশি রিটেইল ব্যাংকিং, কার্ড, ডিজিটাল ব্যাংকিং, কিউআর পেমেন্ট এবং সেলফ-সার্ভিস ব্যাংকিংয়ে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীও সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে রিটেইল ব্যাংকিংকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের রিটেইল ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ১০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ব্যক্তিগত ঋণের পাশাপাশি গৃহঋণ, গাড়ি ঋণ, ন্যানো লোনসহ বিভিন্ন ধরনের রিটেইল পণ্য রয়েছে ব্যাংকটির।
অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসায় দীর্ঘদিন ধরে প্রায়োরিটি ব্যাংকিং ও উচ্চমূল্যের গ্রাহকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বহুজাতিক ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্যালারি অ্যাকাউন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এই গ্রাহকভিত্তি পূবালী ব্যাংকের বিদ্যমান রিটেইল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলে উচ্চমূল্যের ও প্রিমিয়াম গ্রাহক পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বড় লেনদেন সামলানোর মতো আর্থিক ভিত্তি
তবে সম্ভাব্য অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পূবালী ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে। ২০২৫ সালের প্রকাশিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, পূবালী ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ১৪ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানত ছিল প্রায় ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ প্রায় ৭১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা। রিটার্ন অন ইকুইটি ছিল ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। বছরের শেষ দিকে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ২০ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও পূবালী ব্যাংক প্রায় ৬৮৫ কোটি টাকা সমন্বিত মুনাফা করেছে। এ সময়ে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য মুনাফার একটি।
অর্থাৎ, কোনো সম্ভাব্য অধিগ্রহণের মূল্য ও অন্যান্য শর্ত ব্যাংকটির জন্য গ্রহণযোগ্য হলে সেটি আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করার মতো সক্ষমতা পূবালী ব্যাংকের রয়েছে—এমন ধারণার ভিত্তি তৈরি করে এসব সূচক।
দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক বড় সুবিধা
সম্ভাব্য অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পূবালী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হতে পারে এর বিস্তৃত শাখা ও সেবাকেন্দ্রের নেটওয়ার্ক।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শাখার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত—প্রায় ১৮টি। বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের শাখা রয়েছে ৫০০টির বেশি এবং উপশাখা ২৮০টিরও বেশি। ২০২৬ সালে ব্যাংকটি তার ১,০০০তম এটিএম/সিআরএম বুথ উদ্বোধন করেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শহরকেন্দ্রিক ও প্রিমিয়াম গ্রাহকভিত্তির সঙ্গে পূবালী ব্যাংকের এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে গ্রাহকদের জন্য শাখা, উপশাখা ও এটিএম/সিআরএম ব্যবহারের সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবার পরিধিও বাড়িয়েছে পূবালী ব্যাংক। পিআই ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এনপিএসবি, বিইএফটিএন, আরটিজিএস, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, ক্রেডিট কার্ড এবং বাংলা কিউআরসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালের শেষে পিআই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ২৮ হাজার। ওই বছর প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখের বেশি। বড় কোনো রিটেইল পোর্টফোলিও অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ ধরনের লেনদেনে শুধু ঋণ ও আমানত স্থানান্তর করলেই হয় না; গ্রাহকের হিসাব, কার্ড, পেমেন্ট ব্যবস্থা, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং, তথ্য স্থানান্তর এবং সেবার ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হয়।
অধিগ্রহণের আগে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসার সঙ্গে পূবালী ব্যাংকের বিদ্যমান কার্যক্রমের কিছুটা সামঞ্জস্য থাকলেও সম্ভাব্য অধিগ্রহণের আগে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশদভাবে যাচাই করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে পোর্টফোলিওর মূল্যায়ন, ঋণের মান, আমানতের কাঠামো, তহবিল সংগ্রহের ব্যয়, ক্রেডিট কার্ড ব্যবসার অবস্থা, সম্ভাব্য দায়, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়।
এর পাশাপাশি গ্রাহক ধরে রাখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে রিটেইল, কার্ড, স্যালারি ও প্রায়োরিটি ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গ্রাহকভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে মালিকানা বা সেবাদাতা পরিবর্তনের পর এসব গ্রাহকের অভিজ্ঞতা ও সেবার মান ধরে রাখা সম্ভাব্য ক্রেতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা নিয়ে সম্ভাব্য লেনদেনের বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রয় প্রক্রিয়া, ব্যবসার সুনির্দিষ্ট পরিধি কিংবা চূড়ান্ত শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।
তবে পূবালী ব্যাংকের বড় ব্যালান্সশিট, শক্তিশালী আমানতভিত্তি, তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণের হার, দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার রিটেইল ঋণ ব্যবসা এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা বিবেচনায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল পোর্টফোলিও নিয়ে ব্যাংকটির সম্ভাব্য আগ্রহের বিষয়টি ব্যাংকিং খাতে আলোচনায় আসা স্বাভাবিক।
শেষ পর্যন্ত কোনো লেনদেন হবে কি না, কিংবা হলে কোন ব্যাংক তা অধিগ্রহণ করবে—তা নির্ভর করবে বিক্রয় প্রক্রিয়া, মূল্যায়ন, ডিউ ডিলিজেন্স, বাণিজ্যিক শর্ত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ওপর।

চলনবিলের সময় ডেস্ক 
























